প্রতিষ্ঠানের রাজনীতি ও ভাগ্যের ব্যবচ্ছেদ: দারন আসেমোগলু ও জেমস রবিনসনের 'হোয়াই নেশনস ফেইল' পর্যালোচনা
Mallika Jana Hatai


Why Nations Fail: The Origins of Power, Prosperity, and Poverty
Author: Daron Acemoglu & James A. Robinson
Publisher: Crown Business (2012)
Inclusive of all taxes
কেন্দ্রীয় থিসিস ও ইতিহাসের পাঠ: প্রতিষ্ঠানই নিয়তি
কেন একটি সীমানা প্রাচীরের একদিকে দাঁড়িয়ে থাকা আমেরিকার আরিজোনা অঙ্গরাজ্যের নোগালেস শহরের বাসিন্দারা উন্নত জীবনমান, স্বাস্থ্যবীমা এবং নিরাপত্তার সুবিধা পান, অথচ প্রাচীরের অপর প্রান্তের মেক্সিকান নোগালেসের নাগরিকরা দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতায় পিষ্ট হন? নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ দারন আসেমোগলু এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস এ. রবিনসনের কালজয়ী গ্রন্থ হোয়াই নেশনস ফেইল: দ্য অরিজিনস অব পাওয়ার, প্রসপারিটি, অ্যান্ড পভার্টি ঠিক এই মৌলিক বৈপরীত্যের অনুসন্ধান দিয়ে যাত্রা শুরু করে। গ্রন্থটির মূল প্রতিপাদ্য অত্যন্ত স্পষ্ট কিন্তু বৈপ্লবিক: কোনো দেশের উন্নতি বা অবনতি ভৌগোলিক পরিবেশ, আবহাওয়া, জলবায়ু, সংস্কৃতি কিংবা নীতি-নির্ধারকদের অর্থনৈতিক অজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত হয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চরিত্রের ওপর।
"দেশগুলো তখনই ব্যর্থ হয়, যখন সেখানে বিদ্যমান শোষণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতা এবং সম্পদকে সমাজের সর্বস্তরে বিস্তৃত না করে কেবল সংকীর্ণ একটি শাসকগোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জীভূত করে রাখে।"
লেখকরা মানবসমাজকে দুটি প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাসে বিভক্ত করেছেন: অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) এবং শোষণমূলক (Extractive)। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষমতাকে বৃহৎ জনসমষ্টির কাছে বিকেন্দ্রীভূত করে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে; যা পরবর্তীতে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়—যেখানে সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত থাকে, মেধার বিকাশ ঘটে এবং মানুষ উদ্ভাবনে উৎসাহিত হয়। অন্যদিকে, শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান অল্প কিছু সুবিধাভোগী অভিজাত শ্রেণির স্বার্থে সাধারণ মানুষের শ্রম ও সম্পদ লুণ্ঠনের পথ সুগম করে।
সৃজনশীল ধ্বংস এবং ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ
গ্রন্থটিতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়েছে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জোসেফ শুম্পিটারের 'সৃজনশীল ধ্বংস' (Creative Destruction) ধারণাটি। অর্থনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে পুরোনো প্রযুক্তি, অচলায়তন এবং একচেটিয়া ব্যবসাকে ভেঙে নতুন ধারণার পথ তৈরি করতে হয়। তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান অভিজাত শ্রেণি সর্বদাই এই সৃজনশীল ধ্বংসকে ভয় পায়, কারণ অর্থনৈতিক পরিবর্তন অনিবার্যভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যকেও নাড়িয়ে দেয়। রাশিয়ার জার বা অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানরা কেন আধুনিক রেলওয়ে ও মুদ্রণযন্ত্রের আগমনকে বহু দশক ধরে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন, আসেমোগলু ও রবিনসন তার চমৎকার ঐতিহাসিক চিত্র তুলে ধরেছেন।
এছাড়াও লেখকরা তুলে ধরেন 'ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ' (Critical Junctures) এবং 'প্রাতিষ্ঠানিক প্রবাহ' (Institutional Drift)-এর গতিশীলতা। চতুর্দশ শতকে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ মহামারীর সময় পশ্চিম ইউরোপের কৃষকরা দাসত্ব থেকে মুক্তির দিকে এগিয়ে গিয়েছিল শ্রমের সংকটকে কাজে লাগিয়ে, অথচ একই মহামারী পূর্ব ইউরোপে ভূস্বামীদের অবস্থানকে আরও নির্মম ও সংহত করেছিল। ছোট ছোট প্রাতিষ্ঠানিক পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করেই কালক্রমে কীভাবে ইংল্যান্ডের ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লব শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, তার নিখুঁত ব্যবচ্ছেদ রয়েছে এই বয়ানে।
তাত্ত্বিক বলিষ্ঠতা ও গ্রন্থের শক্তি
হোয়াই নেশনস ফেইল-এর সবচেয়ে বড় শক্তি এর বিশাল ঐতিহাসিক ক্যানভাস। লেখকরা প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য, ভেনিসের বাণিজ্যিক উত্থান-পতন, মায়া সভ্যতা, আফ্রিকার সোমালিয়া ও কঙ্গো থেকে শুরু করে আধুনিক বতসোয়ানা ও উত্তর-দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ টেনেছেন এক সুসংহত যুক্তির শিকলে। তাদের গদ্য দুর্বোধ্য অ্যাকাডেমিক পরিভাষায় ভারাক্রান্ত নয়, বরং যুক্তিগ্রাহ্য, টানটান এবং সাহিত্যিক প্রাঞ্জলতায় সমৃদ্ধ। সমকালীন অর্থনৈতিক সাহিত্যে ম্যাক্রো-লেভেল ঐতিহাসিক তুলনার এমন মেলবন্ধন বিরল।
সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা
গ্রন্থটির উজ্জ্বল অন্তর্দৃষ্টি সত্ত্বেও কিছু তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা সমালোচকদের দৃষ্টি এড়ায়নি:
- অতিরিক্ত দ্বৈত বিভাজন: প্রতিষ্ঠানকে কেবল 'অন্তর্ভুক্তিমূলক' এবং 'শোষণমূলক'—এই দুই চরম বাইনারিতে বিভক্ত করা বাস্তব সমাজকাঠামোর জটিল মিশ্র রূপকে কিছুটা সরলীকরণ করে।
- চীনের অর্থনৈতিক উত্থান: রাজনৈতিকভাবে চরম কেন্দ্রীভূত এবং কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনকাঠামো নিয়েও বিগত চার দশকে চীনের অভাবনীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লেখকদের দীর্ঘমেয়াদি ধারণাকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে। যদিও লেখকরা দাবি করেছেন অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া চীনের প্রবৃদ্ধি অচিরেই থমকে যাবে, তবু বর্তমান বাস্তবতা এই তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ককে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।
- উপনিবেশবাদ ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের অবমূল্যায়ন: লেখকরা অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানের ওপর এতটাই জোর দিয়েছেন যে, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর চাপিয়ে দেওয়া রাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠন ও বাহ্যিক অর্থনৈতিক ভূ-রাজনীতির ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়েছে।
চূড়ান্ত অভিমত ও প্রাসঙ্গিকতা
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ক্রান্তিকালীন শাসনব্যবস্থার জন্য এই বইটির প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম। কেন আইনের শাসনের অভাব, অর্থনৈতিক অলিগার্কি এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ব্যর্থতা একটি রাষ্ট্রকে মধ্যম আয়ের ফাঁদে বন্দি করে রাখে, তার নির্মোহ ব্যাখ্যা মেলে এখানে। দারন আসেমোগলু ও জেমস রবিনসন কেবল অতীতকে ব্যাখ্যা করেননি, বরং ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনায়ক ও নাগরিকদের সতর্ক করে দিয়েছেন—ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ব্যতীত কোনো জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। রাজনৈতিক অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের পাঠকদের জন্য এটি আজীবন ফিরে দেখার মতো এক কালজয়ী গ্রন্থ।
Enjoyed this review? Order the physical copy today.
Secure your printed edition with fast doorstep courier delivery.
Related Books You May Also Like
Reader Reviews & Ratings (0)
Real feedback and verified opinions from readers who purchased or read this title.
No reader reviews yet for this publication.

Why Nations Fail: The Origins of Power, Prosperity, and Poverty


















