৫৫টি পদকের রানী ট্রিশা জর্ন: প্যারালিম্পিক কিংবদন্তির ঐতিহাসিক সমতার লড়াই
শুধু সুইমিং পুলে বিশ্বরেকর্ড নয়, প্যারা-অ্যাথলিটদের মর্যাদা ও সমান সুযোগ নিশ্চিতের আন্দোলনে এক ঐতিহাসিক পথপ্রদর্শক

ক্রীড়া ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব থাকেন যাদের অর্জন কেবল রেকর্ডের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের কিংবদন্তি সাঁতারু ট্রিশা জর্ন-হাডসন ঠিক তেমনই এক অনন্য নাম। সাতটি প্যারালিম্পিক গেমসে অংশ নিয়ে মোট ৫৫টি পদক জিতে তিনি বিশ্বের সর্বকালের সবচেয়ে সফল প্যারালিম্পিয়ান। তবে ট্রিশার কাছে নিজের সোনার পদকগুলোর চেয়েও বড় জয় ছিল প্যারা-অ্যাথলিটদের প্রাপ্য সম্মান ও সমতার অধিকার আদায় করা।
দৃষ্টিহীনতা জয় করে পুলের উত্তাল তরঙ্গে
১৯৬৪ সালে জন্ম নেওয়া ট্রিশা জন্ম থেকেই 'অ্যানিরিডিয়া' (Aniridia) নামক একটি বিরল জেনেটিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন। এই রোগে চোখের আইরিস পুরোপুরি বা আংশিক অনুপস্থিত থাকে, যার ফলে তিনি ছিলেন দৃষ্টিহীন। কিন্তু শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা কখনও তাঁর জলকেলির স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারেনি। শৈশব থেকেই তিনি সাধারণ ও শারীরিকভাবে সক্ষম সাঁতারুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বেড়ে ওঠেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই তিনি প্রায় অলিম্পিক দলের ট্রায়ালে কোয়ালিফাই করে ফেলেছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় অলিম্পিক চ্যাপ্টারের এক পরিচালকের পরামর্শে তিনি পরবর্তীতে প্যারালিম্পিক দলে যোগ দেন।
১৯৮০ আর্নহেম: প্রথম আবির্ভাবেই বিশ্বজয়
১৯৮০ সালে নেদারল্যান্ডসের আর্নহেমে প্রথম প্যারালিম্পিকে অংশ নেন তরুণী ট্রিশা। কোনো আগাম প্রত্যাশা ছাড়াই পুলে নেমেছিলেন তিনি। কিন্তু প্রথম আসরেই বাজিমাত করে যে সাতটি ইভেন্টে নেমেছিলেন, তার প্রতিটিতেই স্বর্ণপদক জয় করেন।
আমার কোনো প্রত্যাশা ছিল না। তাই প্রথম আসরেই যখন সাতটি স্বর্ণপদক পেলাম, তখন সেটি আমার ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করে দিয়েছিল। — ট্রিশা জর্ন
সিউল ১৯৮৮: সমমর্যাদার ঐতিহাসিক মোড়
১৯৮০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পথচলায় বহু সাফল্য এলেও ট্রিশার হৃদয়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে ১৯৮৮ সালের সিউল প্যারালিম্পিক। এটি ছিল ইতিহাসের প্রথম আসর, যেখানে কোনো দেশকে অলিম্পিক আয়োজনের অনুমতি পেতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে প্যারালিম্পিকও আয়োজন করার নিয়ম কার্যকর হয়। অলিম্পিক সমাপ্তির মাত্র দুই সপ্তাহ পর একই ভেন্যুতে প্যারা-অ্যাথলিটরা লড়াইয়ে নামেন।
আমরা অলিম্পিক অ্যাথলিটদের মতোই সমান পরিশ্রম করে অনুশীলন করি। সিউল থেকে একই ভেন্যুতে অলিম্পিকের দুই সপ্তাহ পর প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পাওয়াটা ছিল আমাদের জন্য এক বিশাল পদক্ষেপ।
অভাব, বৈষম্য ও আত্মসম্মানের সংগ্রাম
আজকের দিনে প্যারালিম্পিক বিশ্বমঞ্চে যে বৈভব ও স্বীকৃতি পায়, আশির দশকে পরিস্থিতি এমন ছিল না। ট্রিশা ও তাঁর সতীর্থদের প্যারা-অ্যাথলিট হিসেবে দিনাতিপাত করতে হতো চরম প্রতিকূলতার মধ্যে। তাঁদের নিজেদের জার্সির খরচ নিজেদেরই বহন করতে হতো। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় যাত্রার ব্যয়ভার মেটাতে ব্যক্তিগতভাবে ফান্ডরাইজিং বা অর্থ সংগ্রহ করতে হতো অ্যাথলিটদের।
সিডনি ২০০০ ও অনুশীলনের অধিকার আদায়
সিউলের পর ট্রিশা কেবল সুইমিং পুলে সীমাবদ্ধ না থেকে সহযোদ্ধাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার আদায়ে তৎপর হন। ২০০০ সালের সিডনি প্যারালিম্পিকের আগে তিনি একটি যুগান্তকারী পাইলট প্রকল্পের নেতৃত্ব দেন, যার মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্যারা-অ্যাথলিটদের 'ইউএস অলিম্পিক ট্রেনিং সেন্টারে' থাকার এবং অনুশীলনের সুযোগ তৈরি হয়।
তবে এই পরিবর্তনের সূচনা মোটেও সহজ ছিল না; প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে পদে পদে কুসংস্কারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁদের:
- ট্রেনিং সেন্টারের লাইফগার্ডরা প্যারা-অ্যাথলিটদের পুলে নামা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
- দৃষ্টিহীন সাঁতারুরা আদৌ নিরাপদে পুলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সাঁতরাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রকাশ্যে সন্দেহ প্রকাশ করা হতো।
- শারীরিক সক্ষমতাকে মাপকাঠি বানিয়ে প্যারা-অ্যাথলিটদের দ্বিতীয় শ্রেণির অ্যাথলিট হিসেবে বিবেচনা করার চেষ্টা চলত।
এই সমস্ত কটূক্তি ও সন্দেহের জবাব ট্রিশা দিয়েছিলেন পানিতে সাঁতার কেটে এবং প্রশাসনিক স্তরে সচেতনতা গড়ে তুলে। ট্রিশার কথায়, "এই মানসিকতা পরিবর্তনের পেছনে বড় হাতিয়ার ছিল আমাদের নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলন এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটানো।"
হল অব ফেম ও আগামীর উত্তরাধিকার
২০১২ সালে ট্রিশা জর্নকে আন্তর্জাতিক প্যারালিম্পিক হল অব ফেমে (International Paralympic Hall of Fame) অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত এই কিংবদন্তি তৃপ্তির সঙ্গে লক্ষ্য করেন যে, চার দশক আগে যে লড়াই তিনি শুরু করেছিলেন, আজ বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন সেই পথেই অনেকটা এগিয়েছে। পদকের রেকর্ডের চেয়েও ট্রিশার সবচেয়ে বড় স্থায়ী অবদান হলো ক্রীড়াবিশ্বে প্রতিবন্ধকতাকে নয়, খেলোয়াড়ের অদম্য আত্মশক্তিকে মূল্যায়নের ভিত গড়ে দেওয়া।
Official Editorial PDF Edition
Verified PublicationDownload a clean, high-resolution printable copy complete with tables, formulas, and high-res photography. Free for registered readers.
Community Feedback & Editorial Ratings
All Reader Reviews (0)
No reader reviews yet for this story.
Be the first to share your rating and perspective!














