পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে রাষ্ট্রসংঘে প্রস্তাবের পরাজয়: কেন একে ঐতিহাসিক কূটনৈতিক জয় বলছে মরক্কো?
নিরাপত্তা পরিষদে আলজেরিয়া ও পলিসারিও ফ্রন্টের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর কেন স্বস্তিতে রাবাত? জানুন অতীত প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ সমীকরণ

উত্তর আফ্রিকার ভূ-রাজনীতির দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব পশ্চিম সাহারা নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে বড় ধরনের কূটনৈতিক ধাক্কা খেল আলজেরিয়া-সমর্থিত পলিসারিও ফ্রন্ট। রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পশ্চিম সাহারা বিষয়ক প্রস্তাবে প্রতিপক্ষ শিবিরের উত্থাপিত বিভিন্ন সংশোধনী ও চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ পরাজিত হওয়ার পর মরক্কো জুড়ে চলছে তীব্র কূটনৈতিক সন্তোষ ও উৎসবের আবহ। রাবাত এই ফলাফলকে তাদের ঐতিহাসিক সার্বভৌমত্বের দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবিচল আস্থার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিতর্কের মূল বিন্দু: রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে কী ঘটেছিল?
রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পশ্চিম সাহারায় মোতায়েন থাকা শান্তিরক্ষা মিশন ‘মিনুরসো’ (MINURSO)-এর ম্যান্ডেট নবায়ন এবং শান্তি প্রক্রিয়ার রূপরেখা নির্ধারণের সময় বিরোধের তীব্র প্রকাশ ঘটে। আলজেরিয়া এবং তাদের সহযোগী পক্ষগুলো প্রস্তাবের মূল বয়ানে পরিবর্তন এনে সেখানে গণভোটের বাধ্যতামূলক শর্ত কিংবা মানবাধিকার নজরদারির নতুন ধারা যুক্ত করার চেষ্টা করেছিল, যা মূলত মরক্কোর নিয়ন্ত্রিত সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তবে নিরাপত্তা পরিষদের সিংহভাগ সদস্য দেশ সেই সংশোধনীগুলো নাকচ করে দেয় এবং মরক্কোর পেশ করা ২০০৭ সালের ‘স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনা’ (Autonomy Plan)-কে একটি বিশ্বাসযোগ্য, বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধান হিসেবে পুনরায় স্বীকৃতি দেয়। রাবাতের মতে, চরমপন্থী অবস্থান ও অচলাবস্থার নীতির ওপর এটি এক চরম আঘাত।
"রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এই সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, অতীতমুখী ও অবাস্তব দাবির দিন শেষ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মরক্কোর সার্বভৌমত্বের অধীনে বাস্তবসম্মত স্বায়ত্তশাসনকেই একমাত্র টেকসই পথ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।"
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: পাঁচ দশকের অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব
পশ্চিম সাহারা সংকটের শিকড় প্রোথিত রয়েছে ঔপনিবেশিক ইতিহাসে। সংঘাতের প্রধান মাইলফলকগুলো হলো:
- স্প্যানিশ শাসনের অবসান (১৯৭৫): স্পেন পশ্চিম সাহারা ত্যাগ করার পর মরক্কো অঞ্চলটির ওপর ঐতিহাসিক মালিকানা দাবি করে ‘গ্রিন মার্চ’ পরিচালনা করে। অন্যদিকে স্থানীয় সাহরাউয়িদের একাংশ আলজেরিয়ার সমর্থনে ‘পলিসারিও ফ্রন্ট’ গঠন করে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে।
- ১৯৯১ সালের যুদ্ধবিরতি: দীর্ঘ লড়াইয়ের পর রাষ্ট্রসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয় এবং গণভোট আয়োজনের লক্ষ্যে মিনুরসো গঠিত হয়। কিন্তু ভোটার তালিকা ও সংজ্ঞায়ন নিয়ে বিরোধের জেরে গণভোট কখনোই আলোর মুখ দেখেনি।
- মরক্কোর স্বায়ত্তশাসন প্রস্তাব (২০০৭): গণভোটের অচলাবস্থা কাটাতে মরক্কো পুরো অঞ্চলটিকে নিজস্ব সার্বভৌমত্বের অধীনে রেখে বিস্তৃত স্বায়ত্তশাসন প্রদানের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা পায়।
আন্তর্জাতিক সমর্থনের পাল্লা: যেভাবে শক্তিশালী হলো রাবাতের অবস্থান
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে মরক্কোর পক্ষে বৈশ্বিক শক্তির জোরালো মেরুকরণ ঘটেছে। ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোর সার্বভৌমত্বকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তীতে স্পেন, জার্মানি এবং অতি সম্প্রতি ফ্রান্সের মতো প্রভাবশালী ইউরোপীয় দেশগুলো স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে মরক্কোর স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনাই এই সংঘাতের একমাত্র বাস্তবসম্মত সমাধান।
নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক ভোটে এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছে। আফ্রিকা, ইউরোপ ও আরব বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখন আলজেরিয়া-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী ধারণার চেয়ে মরক্কোর স্থিতিশীল অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদারিত্বকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
পলিসারিও ফ্রন্ট ও আলজেরিয়ার প্রতিক্রিয়া
এই কূটনৈতিক ধাক্কায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পলিসারিও ফ্রন্ট ও তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক আলজেরিয়া। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সাহরাউয়ি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে উপেক্ষা করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা পরিষদে বারবার প্রস্তাব খারিজ হওয়া আলজেরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক আধিপত্যের কৌশলকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
ভবিষ্যতের ভূ-রাজনীতি ও টেকসই শান্তির সম্ভাবনা
রাষ্ট্রসংঘের এই সিদ্ধান্তের ফলে উত্তর আফ্রিকায় শক্তির ভারসাম্য মরক্কোর অনুকূলে আরও সুসংহত হলো। ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের কূটনীতি কীভাবে মোড় নিতে পারে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বেশ কয়েকটি দিক তুলে ধরেছেন:
- রাজনৈতিক সংলাপের পুনরুজ্জীবন: নিরাপত্তা পরিষদ মরক্কো, আলজেরিয়া, মৌরিতানিয়া ও পলিসারিওকে নিয়ে চতুর্পক্ষীয় ‘গোলটেবিল বৈঠক’ পুনরায় শুরুর তাগিদ দিয়েছে।
- অর্থনৈতিক একীভূতকরণ: মরক্কো ইতোমধ্যে পশ্চিম সাহারার অবকাঠামো, সমুদ্রবন্দর ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটের সাথে যুক্ত হচ্ছে।
- সীমান্তে নিরাপত্তা ঝুঁকি: কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পলিসারিও ফ্রন্ট গেরিলা বা ড্রোন হামলার মতো উসকানি বাড়াতে পারে, যদিও মরক্কোর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা প্রাচীর ভেদ করা তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন।
মূল নির্যাস
রাষ্ট্রসংঘে প্রস্তাবের এই নিষ্পত্তি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এখন ঐতিহাসিক ভাবাবেগের চেয়ে স্থিতিশীলতা, বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং আঞ্চলিক উন্নয়নই অগ্রাধিকার পাচ্ছে। মরক্কোর এই উল্লাস কেবল একটি ভোটাভুটির জয় নয়, বরং অর্ধশতাব্দীর পুরনো মানচিত্রের বিরোধে তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও বৈধতা প্রতিষ্ঠার এক নির্ণায়ক পদক্ষেপ।
Official Editorial PDF Edition
Verified PublicationDownload a clean, high-resolution printable copy complete with tables, formulas, and high-res photography. Free for registered readers.
Community Feedback & Editorial Ratings
All Reader Reviews (0)
No reader reviews yet for this story.
Be the first to share your rating and perspective!














