পশ্চিমবঙ্গের নদনদী ও ভৌগোলিক বিন্যাস: প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য সম্পূর্ণ তথ্য ও বিশ্লেষণ
উত্তরবঙ্গ থেকে সুন্দরবন: নদীপ্রণালী, উৎস, মোহনা ও পরীক্ষার জন্য জরুরি তথ্যাবলী

পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সার্ভিস (WBCS), পিএসসি (PSC), পুলিশ রিক্রুটমেন্ট ও অন্যান্য রাজ্যভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ভূগোলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পশ্চিমবঙ্গের নদনদী। ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে পশ্চিমবঙ্গের নদীপ্রণালীকে মূলত চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়—উত্তরবঙ্গের নদনদী, গঙ্গা ও তার শাখানদী-উপনদী, পশ্চিমের মালভূমি ও রাঢ় অঞ্চলের নদনদী এবং সুন্দরবন বা উপকূলীয় জোয়ার-ভাটায় পুষ্ট নদীপ্রণালী।
১. উত্তরবঙ্গের নদনদী (North Bengal River System)
উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ নদীই হিমালয়ের বরফগলা জলে পুষ্ট, তাই এগুলি চিরপ্রবাহী। বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং বরফগলা জলের কারণে এই নদীগুলোতে প্রায়শই ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়।
- তিস্তা: উত্তরবঙ্গের প্রধান নদী। এটি সিকিমের জেমু হিমবাহের চো লামু হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশ সীমানায় ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়েছে। তিস্তাকে 'উত্তরবঙ্গের ত্রাস' বলা হয়।
- তোর্ষা: তিব্বতের চুম্বি উপত্যকা থেকে উৎপত্তি হয়ে ভুটানের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে এবং শেষ পর্যন্ত যমুনা (বাংলাদেশ)-তে পতিত হয়েছে।
- জলঢাকা: সিকিম ও ভুটান সীমান্তের বিদাং হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়ে কোচবিহারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
- মহানন্দা: দার্জিলিং জেলার মহলাধিরাম পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে মালদা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা ও পদ্মায় মিশেছে।
- কালজানি, রায়ডাক ও শঙ্খোষ: এই নদীগুলিও ভুটান হিমালয় থেকে নেমে এসে ডুয়ার্স অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় যুক্ত হয়েছে।
"উত্তরবঙ্গের নদীগুলির তীব্র স্রোত এবং পলি সঞ্চয়ের প্রবণতার কারণে প্রতি বছর নদীগর্ভ অগভীর হয়ে পড়ে, যা অঞ্চলটিতে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে থাকে।"
২. মধ্য ও দক্ষিণবঙ্গের মূল নদীপ্রণালী: গঙ্গা ও ভাগীরথী-হুগলি
গঙ্গা নদী রাজমহল পাহাড় পেরিয়ে মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানের কাছে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে। মূল শাখাটি পদ্মা নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং দক্ষিণমুখী শাখাটি ভাগীরথী নামে পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নবদ্বীপের পর থেকে মোহনা পর্যন্ত এই নদী হুগলি নদী নামে পরিচিত।
- উৎস: গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ গুহা।
- পতন: বঙ্গোপসাগর (গঙ্গাসাগর)।
- ভাগীরথী-হুগলির ডান তীরের উপনদী: ময়ূরাক্ষী, অজয়, দামোদর, রূপনারায়ণ, কংসাবতী।
- বাম তীরের উপনদী: জলঙ্গী, চূর্ণী, মাথাভাঙা (ভৈরব)।
৩. পশ্চিমের মালভূমি ও রাঢ় অঞ্চলের নদীপ্রণালী
ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে উৎপন্ন নদীগুলি মূলত বৃষ্টির জলে পুষ্ট। গ্রীষ্মকালে এই নদীগুলি প্রায় শুকিয়ে যায়, তবে বর্ষায় প্রবল প্লাবন সৃষ্টি করে।
- দামোদর: ছোটনাগপুর মালভূমির খামারপাত পাহাড় থেকে উৎপন্ন। পূর্বে এটি 'বাংলার দুঃখ' (Sorrow of Bengal) নামে পরিচিত ছিল। এর ওপর গঠিত ভারতের প্রথম বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনা হলো DVC (Damodar Valley Corporation)।
- সুবর্ণরেখা: রাঁচি মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম সীমানা অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। এই নদীর বালিতে সোনার কণা পাওয়া যেত বলে এর নাম সুবর্ণরেখা।
- ময়ূরাক্ষী: ঝাড়খণ্ডের ত্রিকূট পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে ভাগীরথীতে পতিত হয়েছে। এর ওপর গড়ে উঠেছে ম্যাসনজোর বাঁধ বা কানাডা ড্যাম।
- রূপনারায়ণ ও কংসাবতী: দ্বারকেশ্বর ও শিলাবতীর মিলিত প্রবাহ রূপনারায়ণ নামে পরিচিত। অন্যদিকে কাঁসাই বা কংসাবতী নদী মেদিনীপুরের কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড।
৪. সুন্দরবন অঞ্চলের জোয়ার-ভাটায় পুষ্ট নদী
সুন্দরবনের নদীগুলি মূলত মিষ্টি জলের প্রবাহ না পেয়ে বঙ্গোপসাগরের নোনা জোয়ারের জলে পুষ্ট হয়। অধিকাংশ নদীই একে অপরের সঙ্গে খাঁড়ির মাধ্যমে যুক্ত।
- প্রধান নদীসমূহ: মাতলা, গোসাবা, বিদ্যাধরী, রায়মঙ্গল, পিয়ালী, সপ্তমুখী, কালিন্দী ও ঠাকুরান।
- বৈশিষ্ট্য: এগুলি জোয়ারের সময় প্লাবিত হয় এবং ভাটার সময় জল নেমে যায়। এই নদীগুলিতে পলি জমে অনেক খাঁড়ি তৈরি হয়েছে যা ম্যানগ্রোভ অরণ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এক নজরে পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ নদনদী (Quick Revision Table)
- তিস্তা: উৎস - চো লামু হ্রদ (সিকিম); পতন - ব্রহ্মপুত্র নদ; বিশেষত্ব - উত্তরবঙ্গের দীর্ঘতম নদী ও ত্রাস।
- দামোদর: উৎস - ছোটনাগপুর মালভূমি; পতন - হুগলি নদী; বিশেষত্ব - বাংলার দুঃখ ও DVC প্রকল্প।
- মহানন্দা: উৎস - মহলাধিরাম পাহাড় (দার্জিলিং); পতন - পদ্মা নদী; বিশেষত্ব - উত্তর ও দক্ষিণ মালদার সীমানা বিভাজক।
- সুবর্ণরেখা: উৎস - রাঁচি মালভূমি; পতন - বঙ্গোপসাগর; বিশেষত্ব - পশ্চিমবঙ্গের সীমানাবর্তী নদী।
- মাতলা: উৎস - হুগলির শাখা ও জোয়ারের জল; পতন - বঙ্গোপসাগর; বিশেষত্ব - সুন্দরবনের অত্যন্ত বিপজ্জনক জোয়ার-ভাটার নদী।
"পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক বিন্যাসে নদীগুলির অবস্থান শুধুমাত্র সেচ ও কৃষিকাজের ভিত্তি নয়, বরং রাজ্যভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর তোলার ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য অধ্যায়।"
Official Editorial PDF Edition
Verified PublicationDownload a clean, high-resolution printable copy complete with tables, formulas, and high-res photography. Free for registered readers.
Community Feedback & Editorial Ratings
All Reader Reviews (0)
No reader reviews yet for this story.
Be the first to share your rating and perspective!














