পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত: প্যালেস্টাইন–ইজরায়েল থেকে ইরান, লেবানন ও হুথি—ইতিহাস, শক্তির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ
ভূখণ্ডের দাবি, নিরাপত্তা, সশস্ত্র সংগঠন, ধর্মীয় পরিচয়, তেল-বাণিজ্য এবং বিশ্বশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা কীভাবে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতকে জটিল করে তুলেছে

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত: ইজরায়েল–প্যালেস্টাইন থেকে ইরান, লেবানন ও হুথি—ইতিহাস, শক্তির রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক স্বার্থের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ
DNN7 | আন্তর্জাতিক সম্পর্ক | ভূরাজনীতি | ইতিহাস ও কূটনীতি
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতকে শুধু ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইনের যুদ্ধ হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত চিত্র বোঝা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্যালেস্টাইনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি, ইজরায়েলের নিরাপত্তা, গাজার মানবিক বিপর্যয়, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরানের আঞ্চলিক কৌশল, ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক ভূমিকা, উপসাগরীয় দেশগুলির স্বার্থ এবং লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ।
২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের গাজা যুদ্ধবিরতির পরও সেখানে প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির সমস্যা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের ইরানে হামলা, ইরানের পাল্টা আক্রমণ এবং লেবাননে ইজরায়েল–হিজবুল্লাহ সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। একাধিক যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ থাকলেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান এখনও অনিশ্চিত।
এই প্রতিবেদনে সংঘাতের ঐতিহাসিক শিকড়, প্রধান পক্ষগুলির পরিচয়, তাদের লক্ষ্য, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলির স্বার্থ, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এবং সম্ভাব্য শান্তির পথ বিশ্লেষণ করা হলো।
১. প্রথমে বুঝতে হবে: কারা এই সংঘাতের অংশ?
প্যালেস্টাইন ও গাজার মানুষ
প্যালেস্টাইনিরা আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বাধীন রাষ্ট্র, ভূখণ্ডের অধিকার এবং শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করছেন। গাজা ও পশ্চিম তীরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নয়; প্যালেস্টাইনিদেরও একাধিক রাজনৈতিক মত ও সংগঠন রয়েছে।
ইজরায়েল
ইজরায়েলের প্রধান নিরাপত্তাগত উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা, জিম্মিদের মুক্তি, সীমান্ত সুরক্ষা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা। ইজরায়েলের সরকার, বিরোধী দল ও সাধারণ নাগরিকদের মতামত অবশ্য এক নয়।
ইরান
ইরান তার আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধে রয়েছে। হিজবুল্লাহ, হুথি ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে তার সম্পর্ক সংঘাতের আঞ্চলিক বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ।
লেবানন ও হিজবুল্লাহ
লেবানন একটি পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্র। হিজবুল্লাহ লেবাননের একটি সশস্ত্র ও রাজনৈতিক সংগঠন, যার ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। হিজবুল্লাহর সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব লেবাননের সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রের উপরও পড়ে।
ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন
হুথিরা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের একটি প্রধান সশস্ত্র ও রাজনৈতিক পক্ষ। গাজা যুদ্ধের সময় ইজরায়েল-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ও লোহিত সাগরের জাহাজে তাদের হামলা সংঘাতকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌনিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এই পক্ষগুলিকে একক রাজনৈতিক শিবির হিসেবে দেখা ঠিক নয়। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, সশস্ত্র সংগঠন, ধর্মীয় সম্প্রদায় ও সাধারণ নাগরিক—প্রত্যেকের ভূমিকা ও স্বার্থ আলাদা।
২. ঐতিহাসিক পটভূমি: সংঘাতের শিকড় কোথায়?
১৯১৭–১৯৪৭: ব্রিটিশ শাসন ও পরস্পরবিরোধী জাতীয় আকাঙ্ক্ষা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের ফলে প্যালেস্টাইন অঞ্চল ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে আসে। ১৯১৭ সালের Balfour Declaration-এ ব্রিটিশ সরকার প্যালেস্টাইনে ইহুদি জনগণের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার সমর্থন জানায়। একই সময়ে আরব প্যালেস্টাইনিরাও নিজেদের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার দাবি করছিলেন।
ইউরোপে ইহুদিবিদ্বেষ এবং নাৎসি নিপীড়নের ফলে ইহুদি অভিবাসনের গুরুত্ব আরও বাড়ে। অন্যদিকে, আরব প্যালেস্টাইনিদের মধ্যে জমি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অভিবাসন এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ ও বিরোধ তীব্র হয়। ব্রিটিশ প্রশাসন এই প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় আকাঙ্ক্ষার স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি।
১৯৪৭: জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনা
১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ Resolution 181 গ্রহণ করে। পরিকল্পনাটি ছিল একটি ইহুদি রাষ্ট্র এবং একটি আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা; জেরুজালেমের জন্য বিশেষ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাবও ছিল।
ইহুদি নেতৃত্ব পরিকল্পনাটি গ্রহণ করলেও প্যালেস্টাইনি আরব নেতৃত্ব ও আরব রাষ্ট্রগুলি তা প্রত্যাখ্যান করে। তাদের আপত্তির মধ্যে ছিল ভূখণ্ড বণ্টন ও রাজনৈতিক ন্যায্যতার প্রশ্ন। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়নি।
১৯৪৮: ইজরায়েল প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধ ও নাকবা
১৯৪৮ সালে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথম আরব–ইজরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের সময় প্রায় ৭,৫০,০০০ প্যালেস্টাইনি পালিয়ে যান বা নিজেদের বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত হন বলে বহুল উদ্ধৃত ঐতিহাসিক হিসাব রয়েছে। প্যালেস্টাইনিরা এই ব্যাপক বাস্তুচ্যুতিকে নাকবা (Nakba)—অর্থাৎ বিপর্যয়—বলে স্মরণ করেন।
একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক ইহুদি বাস্তুচ্যুত হন বা ইজরায়েলে চলে আসেন। দুই জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক স্মৃতি, নিরাপত্তার উদ্বেগ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞতা পরবর্তী রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
১৯৬৭: ছয় দিনের যুদ্ধ ও দখলদারির প্রশ্ন
১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইজরায়েল গাজা, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, গোলান মালভূমি ও সিনাইয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে সিনাই মিশরকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়; অন্য অঞ্চলগুলির অবস্থান নিয়ে বিরোধ চলতে থাকে।
পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা প্যালেস্টাইনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নের কেন্দ্রে চলে আসে। বসতি সম্প্রসারণ, চলাচলের স্বাধীনতা, সীমান্ত, নিরাপত্তা এবং ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ স্থায়ী শান্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৮৭–১৯৯৫: ইন্তিফাদা ও অসলো চুক্তি
১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদা বা প্যালেস্টাইনি গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়। ১৯৯৩ সালে ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (PLO) অসলো চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে পারস্পরিক স্বীকৃতি ও সীমিত প্যালেস্টাইনি স্বশাসনের পথ তৈরি হয়।
কিন্তু জেরুজালেমের মর্যাদা, শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ, বসতি, সীমান্ত এবং চূড়ান্ত রাষ্ট্রকাঠামোর মতো বিষয়গুলি স্থায়ীভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে শান্তি-প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত স্বাধীন ও সার্বভৌম প্যালেস্টাইনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
২০০৬–২০২৩: গাজা, হামাস ও অবরোধ
২০০৬ সালের প্যালেস্টাইনি নির্বাচনে হামাস জয়ী হয়। ২০০৭ সালে গাজায় হামাসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ইজরায়েল ও মিশর গাজায় প্রবেশ ও চলাচলের উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে; বিভিন্ন সময়ে অবরোধের মাত্রা ও নিয়ম পরিবর্তিত হয়েছে।
হামাস একটি প্যালেস্টাইনি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগঠন। ইজরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ একাধিক দেশ হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে; অন্যদিকে হামাস প্যালেস্টাইনি রাজনীতির একটি প্রধান পক্ষ হিসেবে গাজায় দীর্ঘদিন শাসন করেছে।
গাজায় বারবার যুদ্ধ, রকেট হামলা, ইজরায়েলি সামরিক অভিযান, অবরোধ ও মানবিক সংকটের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমাগত বেড়েছে।
৭ অক্টোবর ২০২৩: সংঘাতের নতুন বিস্তার
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলায় ইজরায়েলে ১,২০০-র বেশি মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর পর ইজরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজার বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত, আহত ও বাস্তুচ্যুত হন; আবাসন, হাসপাতাল, জল ও বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়।
এই যুদ্ধ শুধু গাজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হিজবুল্লাহ ইজরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালায়, হুথিরা লোহিত সাগরে জাহাজ ও ইজরায়েল-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে আক্রমণ করে এবং ইরান-ইজরায়েল সংঘাত আরও সরাসরি রূপ নিতে থাকে।
৩. গাজা: যুদ্ধবিরতি থাকলেও কেন সংকট শেষ হয়নি?
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর গাজায় বড় ধরনের যুদ্ধের মাত্রা কমলেও সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ২০২৬ সালের অক্টোবরেও ইজরায়েলি হামলা, গোলাবর্ষণ, গুলিবর্ষণ এবং সামরিক অভিযান থেকে হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর OCHA-র ১৫ অক্টোবর ২০২৬-এর পরিস্থিতি প্রতিবেদনে কয়েকটি উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে:
গাজার প্রায় ৯,৫০,০০০ বাস্তুচ্যুত মানুষ মাঝারি থেকে উচ্চ বন্যাঝুঁকির মধ্যে থাকা আশ্রয়স্থলে বসবাস করছিলেন।
প্রায় ২,৯৪,২৫০ পরিবারের শীতকালীন আশ্রয় সহায়তা প্রয়োজন ছিল; উপলভ্য সামগ্রী দিয়ে চাহিদার মাত্র ১৮ শতাংশ পরিবারকে আংশিক সহায়তা করা সম্ভব ছিল।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও গাজায় নতুন করে প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
চিকিৎসা, জ্বালানি, নিরাপদ পানীয় জল এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা চালু রাখার ক্ষেত্রে ঘাটতি অব্যাহত ছিল।
গাজার মানুষের প্রধান সমস্যা
বাসস্থান ও বাস্তুচ্যুতি
বহু পরিবার তাঁবু, অস্থায়ী আশ্রয় অথবা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাস করছে। বৃষ্টি ও শীতের সময় এই পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য
হাসপাতাল, ওষুধ, জ্বালানি এবং বিশেষায়িত চিকিৎসার অভাব গুরুতর রোগী ও আহতদের চিকিৎসা কঠিন করে তুলছে।
জল, খাদ্য ও স্যানিটেশন
খাদ্য বিতরণ চললেও মানুষের প্রয়োজন সম্পূর্ণ মেটানো যাচ্ছে না। পানীয় জল ও নিকাশি পরিষেবা দুর্বল হলে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
শিক্ষা ও শিশুদের ভবিষ্যৎ
বিদ্যালয় ধ্বংস, নিরাপত্তাহীনতা ও শিক্ষাসামগ্রীর অভাবে বহু শিশু নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
গাজার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে মূল বিরোধ
গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করা এবং গাজাকে কে শাসন করবে—এই দুটি আলাদা প্রশ্ন।
ইজরায়েল চায় হামাসের সামরিক সক্ষমতা দূর হোক এবং ভবিষ্যতে ইজরায়েলের নিরাপত্তার জন্য গাজা থেকে হুমকি না আসুক। হামাস অস্ত্র ত্যাগের প্রশ্নে আপত্তি জানিয়েছে। অন্যদিকে, প্যালেস্টাইনি জনগণের মধ্যে এমন একটি গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, যা রাজনৈতিক বৈধতা, নিরাপত্তা, পুনর্গঠন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে।
এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: হামাসের সঙ্গে সংঘাত এবং প্যালেস্টাইনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি একই বিষয় নয়। একটি সশস্ত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ডের জন্য সমগ্র জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা যায় না।
৪. পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম: গাজার বাইরে আরেকটি সংকট
ইজরায়েল–প্যালেস্টাইন সংঘাতের আলোচনা প্রায়ই গাজাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। কিন্তু পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমেও ভূমি, বসতি, নিরাপত্তা, চলাচল এবং রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
OCHA-র ১৫ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৬ সালের অক্টোবরের প্রথম দুই সপ্তাহে পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি বাহিনী বা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে পাঁচজন প্যালেস্টাইনি নিহত এবং ২৪০-এর বেশি আহত হন। একই সময়ে জলপাই সংগ্রহকে কেন্দ্র করে বসতি স্থাপনকারীদের বহু হামলার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়।
কেন পশ্চিম তীর গুরুত্বপূর্ণ?
প্যালেস্টাইনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য ভূখণ্ডের একটি প্রধান অংশ পশ্চিম তীর।
ইজরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ভবিষ্যৎ সীমান্ত ও ভূখণ্ডের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
প্যালেস্টাইনি কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা ও বাস্তব নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন।
পূর্ব জেরুজালেমের মর্যাদা এবং পবিত্র স্থানগুলির নিয়ন্ত্রণ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) ২০২৪ সালের পরামর্শমূলক মতামতে অধিকৃত প্যালেস্টাইনি ভূখণ্ডে ইজরায়েলের নীতি ও উপস্থিতির আইনি পরিণতি নিয়ে আলোচনা করেছে। ইজরায়েল এই আইনি মূল্যায়ন ও তার ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয়। এই বিরোধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন, সংশ্লিষ্ট রায় এবং পক্ষগুলির অবস্থান আলাদা করে বিচার করা প্রয়োজন।
৫. ইজরায়েল ও হিজবুল্লাহ: লেবানন কেন যুদ্ধের আরেকটি কেন্দ্র?
লেবাননের সঙ্গে ইজরায়েলের সংঘাতের ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। ১৯৮২ সালে লেবাননে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান, ২০০৬ সালের যুদ্ধ এবং ২০২৩–২০২৪ সালের সীমান্ত সংঘর্ষ এই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
হিজবুল্লাহ লেবাননের একটি শক্তিশালী সশস্ত্র ও রাজনৈতিক সংগঠন। ইরান তাকে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রসহায়তা দিয়ে এসেছে বলে আন্তর্জাতিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। হিজবুল্লাহ নিজেদের ইজরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধশক্তি হিসেবে তুলে ধরে; ইজরায়েল তাকে নিজের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি বলে বিবেচনা করে।
২০২৬ সালের সংঘাতের নতুন পর্যায়
২০২৬ সালের ১ মার্চ ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলার পর হিজবুল্লাহ ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইজরায়েল পাল্টা বিমান হামলা এবং দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করে। জুন ২০২৬-এ লেবানন, ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত নিরসনের একটি ত্রিপাক্ষিক কাঠামো তৈরি হয়। এর মধ্যে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ, লেবাননের সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে ইজরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের বিষয় রয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের সময়সীমা ও পদ্ধতি নিয়ে অচলাবস্থা রয়ে গেছে।
লেবাননের সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব
দক্ষিণ লেবাননের বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
বাড়িঘর ও পরিকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে।
লেবাননের দুর্বল অর্থনীতি ও রাজনৈতিক কাঠামোর উপর আরও চাপ তৈরি হয়েছে।
হিজবুল্লাহর সামরিক ভূমিকা এবং লেবাননের রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক বেড়েছে।
মূল দ্বন্দ্ব: ইজরায়েল চায় তার উত্তর সীমান্ত থেকে হিজবুল্লাহর সামরিক হুমকি দূর হোক। হিজবুল্লাহ ইজরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের অধিকার দাবি করে। লেবাননের রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে সার্বভৌমত্ব, নাগরিক নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়।
৬. ইরান–ইজরায়েল সংঘাত: আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরাসরি যুদ্ধ
ইরান ও ইজরায়েলের বিরোধ শুধু ধর্মীয় মতপার্থক্যের ফল নয়। এর মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক নেতৃত্ব, সামরিক নিরাপত্তা, পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র, নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির ভূমিকা।
দীর্ঘদিন দুই দেশের মধ্যে গোপন অভিযান, সাইবার আক্রমণ, পরোক্ষ সংঘাত এবং মিত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালে সরাসরি হামলার পর সংঘাতের ধরন বদলাতে থাকে।
২০২৫ ও ২০২৬ সালের যুদ্ধ
২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ হয়; যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল আবার ইরানে হামলা শুরু করে। Council on Foreign Relations-এর ২৩ অক্টোবর ২০২৬-এ হালনাগাদ করা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই নিহত হন এবং পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হয়। পরে যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা হলেও উভয় পক্ষের মধ্যে সীমিত হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের প্রধান স্বার্থ
1. রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্ব।
2. ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ মোকাবিলা।
3. পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে নিজের অবস্থান বজায় রাখা।
4. আঞ্চলিক মিত্র ও অংশীদারদের মাধ্যমে কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখা।
5. আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার।
ইজরায়েলের প্রধান স্বার্থ
1. ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সম্ভাবনা ঠেকানো।
2. ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার হুমকি কমানো।
3. হিজবুল্লাহ ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সামরিক সক্ষমতা সীমিত করা।
4. ইজরায়েলের ভূখণ্ড ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
দুই পক্ষের ঘোষিত লক্ষ্য ও নিরাপত্তার ব্যাখ্যা এক নয়। ইরান তার সামরিক সক্ষমতাকে প্রতিরোধের অংশ হিসেবে তুলে ধরে; ইজরায়েল সেটিকে অস্তিত্বগত নিরাপত্তার হুমকি বলে বিবেচনা করে।
কেন কূটনৈতিক সমাধান কঠিন?
পারমাণবিক কর্মসূচির সীমা, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন, ক্ষেপণাস্ত্র, নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং সামরিক হামলার জবাব—এই বিষয়গুলিকে একই সমঝোতার মধ্যে আনা কঠিন। এক পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা অন্য পক্ষের কাছে দুর্বলতা বা হুমকি বলে মনে হতে পারে।
তাই যুদ্ধবিরতি হলেও স্থায়ী শান্তির জন্য যাচাইযোগ্য চুক্তি, যোগাযোগের ব্যবস্থা এবং পারস্পরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা জরুরি।
৭. ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন: কেন লোহিত সাগরের সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে?
হুথি আন্দোলন (Ansar Allah) ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলন। ২০১৪ সালে তারা রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আরও জটিল হয়ে ওঠে। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে সমর্থন করেছিল। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি বড় ধরনের সংঘর্ষ কমালেও ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি।
গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযানের পর হুথিরা প্যালেস্টাইনিদের সমর্থনের কথা বলে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের সামরিক প্রতিক্রিয়ায় ইয়েমেনও বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ হয়ে ওঠে।
হুথিদের উদ্দেশ্য কী?
ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা।
প্যালেস্টাইনিদের প্রতি সমর্থন প্রদর্শনের মাধ্যমে আঞ্চলিক রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন।
ইজরায়েল ও তার মিত্রদের উপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা।
ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক থেকে সুবিধা পাওয়া।
তবে হুথিদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সরাসরি ইরানের নির্দেশে নেওয়া হয়—এমন সরল ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। ইরানের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হলেও হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এবং স্থানীয় ক্ষমতার সমীকরণও বিবেচনায় রাখতে হয়।
লোহিত সাগর এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
লোহিত সাগর, বাব-এল-মান্দেব প্রণালি এবং সুয়েজ খাল ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ তৈরি করে। এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল বিপজ্জনক হয়ে উঠলে কিছু জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে যেতে হয়।
এর ফলে—
জাহাজের যাত্রার সময় বাড়তে পারে।
জ্বালানি ও পরিবহণ ব্যয় বাড়ে।
বীমার প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পেতে পারে।
সরবরাহব্যবস্থা ও পণ্যের দাম প্রভাবিত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক নৌনিরাপত্তা ও সামরিক উপস্থিতি নিয়ে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
অর্থাৎ, ইয়েমেনের একটি আঞ্চলিক সংঘাতও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি ও মুদ্রাস্ফীতির উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
৮. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ: কার কী ভূমিকা?
এই সংঘাতে শুধু ইজরায়েল, প্যালেস্টাইন, ইরান, লেবানন ও হুথিরাই নয়—আরও একাধিক রাষ্ট্র, সংগঠন ও জনগোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে।
পক্ষ | প্রধান স্বার্থ ও ভূমিকা |
|---|---|
হামাস | গাজার একটি প্রধান প্যালেস্টাইনি রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগঠন; ইজরায়েলের সঙ্গে সংঘাত, জিম্মি ও নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্নে কেন্দ্রীয় পক্ষ। |
PLO ও প্যালেস্টাইনি কর্তৃপক্ষ | প্যালেস্টাইনি জাতীয় প্রতিনিধিত্ব, পশ্চিম তীরের প্রশাসন ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত। |
হিজবুল্লাহ | লেবাননের রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগঠন; ইজরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক অবস্থান এবং ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। |
ইরাকের ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী | আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা ও মার্কিন উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। |
সিরিয়া | দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে সংঘাতের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত। |
সৌদি আরব | উপসাগরীয় নিরাপত্তা, ইয়েমেন, জ্বালানি বাজার এবং ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে চায়। |
কাতার | মধ্যস্থতা, হামাসের সঙ্গে যোগাযোগ এবং যুদ্ধবিরতি আলোচনায় ভূমিকা রেখেছে। |
মিশর | গাজার সঙ্গে সীমান্ত, মানবিক সহায়তা, যুদ্ধবিরতি এবং প্যালেস্টাইনি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। |
জর্ডান | সীমান্ত নিরাপত্তা, প্যালেস্টাইনি শরণার্থী, পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমের বিষয়গুলিতে বিশেষ স্বার্থ রয়েছে। |
তুরস্ক | প্যালেস্টাইন প্রশ্নে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং নিজস্ব নিরাপত্তা-স্বার্থ নিয়ে সক্রিয়। |
যুক্তরাষ্ট্র | ইজরায়েলের প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার; সামরিক সহায়তা, কূটনীতি, ইরাননীতি এবং আঞ্চলিক নৌনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ। |
রাশিয়া ও চীন | কূটনীতি, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে অবস্থান, জ্বালানি, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক প্রভাবের মাধ্যমে ভূমিকা রাখে। |
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা | মানবিক সহায়তা, যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টা, শরণার্থী সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে কাজ করে। |
এই তালিকার প্রতিটি পক্ষের ভূমিকা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। কোনো রাষ্ট্রের কূটনৈতিক বক্তব্য, সামরিক সহায়তা, বাস্তব সামরিক অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক আইনগত দায় এক বিষয় নয়।
৯. যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ: কেন ওয়াশিংটন এত গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাষ্ট্রের ইজরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা, সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সক্রিয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য
১. ইজরায়েলের নিরাপত্তা: যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলকে সামরিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সমর্থন দেয়।
২. ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা: ওয়াশিংটন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভূমিকা সীমিত করতে চায়।
৩. সামুদ্রিক বাণিজ্য: হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৪. আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব: সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান ও মিশরের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কৌশলের অংশ।
৫. যুদ্ধের বিস্তার ঠেকানো: ইরান, ইজরায়েল ও তাদের অংশীদারদের সংঘাত পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়তে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়ে নিজ দেশেও রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। ইজরায়েলকে সমর্থন, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, অস্ত্র সরবরাহ, যুদ্ধবিরতি এবং প্যালেস্টাইনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে বিভিন্ন অবস্থান দেখা যায়।
১০. রাশিয়া, চীন ও ইউরোপের স্বার্থ
রাশিয়া
রাশিয়ার জন্য পশ্চিম এশিয়া কূটনৈতিক প্রভাব, অস্ত্র ও জ্বালানি বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি ক্ষেত্র। রাশিয়া আঞ্চলিক বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার মাধ্যমে কূটনৈতিক ভূমিকা বজায় রাখার চেষ্টা করে।
চীন
চীনের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ হলো—
উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখা।
বাণিজ্য ও বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের নিরাপত্তা।
ইরান ও আরব রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা।
বৃহৎ যুদ্ধ ও সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া ঠেকানো।
চীনের কূটনীতি সাধারণত রাষ্ট্রগুলির সার্বভৌমত্ব ও আলোচনার উপর জোর দেয়। তবে অর্থনৈতিক প্রভাব থাকা মানেই প্রতিটি সংঘাতে সরাসরি সামরিক ভূমিকা রয়েছে—এমন নয়।
ইউরোপীয় দেশগুলি
ইউরোপের স্বার্থের মধ্যে রয়েছে মানবিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক আইন, শরণার্থী ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি ও বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদের মধ্যে ইজরায়েল, প্যালেস্টাইনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি, অস্ত্রনীতি এবং যুদ্ধবিরতি নিয়ে অবস্থানগত পার্থক্য রয়েছে।
১১. উপসাগরীয় দেশগুলির ভূমিকা: সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিশর
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আরব রাষ্ট্রগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরব: ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো, ইয়েমেনের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি বাজার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা তার গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ।
কাতার: বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতার কারণে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি-সংক্রান্ত আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় আগ্রহী।
মিশর: গাজার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, মানবিক সাহায্য, প্যালেস্টাইনি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং যুদ্ধবিরতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জর্ডান: সীমান্ত নিরাপত্তা, শরণার্থী সমস্যা এবং জেরুজালেমের ধর্মীয় পবিত্র স্থানগুলির সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই রাষ্ট্রগুলি সব বিষয়ে একমত নয়। তাদের অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ আলাদা।
১২. সংঘাতের পেছনে ধর্ম, জাতীয়তাবাদ ও পরিচয়ের ভূমিকা
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতকে শুধু সুন্নি–শিয়া বিরোধ বা ইহুদি–মুসলিম সংঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঐতিহাসিকভাবে অসম্পূর্ণ।
ইহুদি পরিচয় ও ইজরায়েল
ইহুদিদের এই অঞ্চলের সঙ্গে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোপীয় ইহুদিবিদ্বেষ, হলোকাস্ট এবং নিরাপদ জাতীয় আবাসভূমির আকাঙ্ক্ষা আধুনিক ইহুদি জাতীয়তাবাদ ও ইজরায়েল প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
প্যালেস্টাইনি জাতীয় পরিচয়
প্যালেস্টাইনিদের নিজস্ব জাতীয় পরিচয়, ভূখণ্ড, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, শরণার্থী প্রত্যাবর্তন এবং দখলদারির অবসানের দাবি রয়েছে। তাঁদের সংগ্রামকে শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করলে জাতীয়তাবাদ, ভূমির অধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন আড়ালে চলে যায়।
সুন্নি–শিয়া বিভাজন ও আঞ্চলিক রাজনীতি
ইরান শিয়া-প্রধান রাষ্ট্র। লেবাননের হিজবুল্লাহও শিয়া সংগঠন। অন্যদিকে, হুথি আন্দোলন জায়েদি শিয়া ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। হামাস সুন্নি ইসলামপন্থী সংগঠন হলেও ইরানের সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।
এই সম্পর্কগুলি দেখায় যে ধর্মীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামরিক সহায়তা এবং অভিন্ন প্রতিপক্ষের প্রশ্নে বিভিন্ন গোষ্ঠী ধর্মীয় বিভাজন অতিক্রম করে সহযোগিতা করতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ: ইহুদি, মুসলিম, খ্রিস্টান, সুন্নি, শিয়া বা অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষকে কোনো সরকার বা সশস্ত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ডের জন্য সমষ্টিগতভাবে দায়ী করা যায় না।
১৩. আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের আইনি বিশ্লেষণে কয়েকটি পৃথক বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন
সশস্ত্র সংঘাতের সময় বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া, আহতদের চিকিৎসা, আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে মানবিক আচরণ এবং সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুত্বপূর্ণ নীতি।
সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে বেসামরিক ক্ষতি, সামরিক প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা এবং সতর্কতা গ্রহণের মতো বিষয় বিচার করতে হয়।
আত্মরক্ষার অধিকার ও সীমা
রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার দাবি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষ। আত্মরক্ষার দাবি থাকলেই সব ধরনের সামরিক পদক্ষেপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয় না।
প্যালেস্টাইনি আত্মনিয়ন্ত্রণ
জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাব ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের মতামতে প্যালেস্টাইনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং অধিকৃত ভূখণ্ডের আইনি অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের ICJ পরামর্শমূলক মতামতও এই প্রশ্নে উল্লেখযোগ্য।
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ
বিভিন্ন পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ বা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট আদালতের এখতিয়ার এবং বিচারিক সিদ্ধান্ত আলাদা করে বিবেচনা করা জরুরি। অভিযোগ ওঠা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
১৪. সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ: সবচেয়ে বড় ক্ষতি কার?
যুদ্ধের কৌশলগত ফলাফল নিয়ে রাষ্ট্র ও সামরিক সংগঠনগুলির আলোচনা চললেও সাধারণ মানুষের ক্ষতি সবচেয়ে প্রত্যক্ষ।
জনগোষ্ঠী | প্রধান ঝুঁকি |
|---|---|
গাজার প্যালেস্টাইনি পরিবার | প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও চিকিৎসার অভাব |
পশ্চিম তীরের প্যালেস্টাইনি জনগণ | বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, চলাচলের বাধা, বাড়িঘর ভাঙা ও ভূমি হারানোর আশঙ্কা |
ইজরায়েলের সীমান্তবর্তী নাগরিক | ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, জিম্মি-সংকট, বাস্তুচ্যুতি ও নিরাপত্তাহীনতা |
লেবাননের সাধারণ মানুষ | বিমান হামলা, বাড়িঘরের ক্ষতি, বাস্তুচ্যুতি ও অর্থনৈতিক সংকট |
ইরানের নাগরিক | সামরিক হামলা, অবকাঠামোর ক্ষতি, প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা |
ইয়েমেনের জনগণ | দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, খাদ্য ও স্বাস্থ্য সংকট, দারিদ্র্য এবং বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া |
শরণার্থী ও অভিবাসী | নিরাপদ আশ্রয়, আইনি মর্যাদা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা |
গাজার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন দেখায় যে যুদ্ধবিরতির পরও বাস্তুচ্যুতি, আশ্রয় সংকট এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে।
মানবিক সংকটকে শুধু নিহতের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা হারানো, প্রতিবন্ধিতা, মানসিক আঘাত, পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং জীবিকা ধ্বংস হওয়ার প্রভাব বহু বছর স্থায়ী হতে পারে।

১৫. সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব: তেল, জাহাজ চলাচল ও বিশ্ববাজার
পশ্চিম এশিয়া বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী অঞ্চলের একটি। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগর–সুয়েজ পথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ করিডর।
তেলের বাজার
ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা হতে পারে।
জাহাজ পরিবহণ
লোহিত সাগর ও বাব-এল-মান্দেব প্রণালিতে হামলার ঝুঁকি বাড়লে জাহাজকে দীর্ঘ পথ নিতে হতে পারে। এতে পরিবহণ খরচ, বীমা এবং পণ্য পৌঁছানোর সময় বাড়ে।
ভারতের উপর প্রভাব
ভারত পশ্চিম এশিয়া থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় কর্মী বসবাস করেন।
তাই সংঘাতের প্রভাব ভারতের ক্ষেত্রে কয়েকভাবে দেখা দিতে পারে:
অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে।
দীর্ঘ সামুদ্রিক পথের কারণে পরিবহণ খরচ বাড়তে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত ভারতীয়দের নিরাপত্তা ও প্রত্যাবাসনের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
বাণিজ্য, রেমিট্যান্স ও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ভারতের উপর চাপ বাড়তে পারে।
তবে তেলের দাম বা ভারতের অর্থনীতির উপর নির্দিষ্ট প্রভাব কতটা হবে, তা সরবরাহের বাস্তব অবস্থা, যুদ্ধের বিস্তার, বাজারের প্রতিক্রিয়া ও বিকল্প পরিবহণপথের উপর নির্ভর করে।
১৬. যুদ্ধবিরতি কেন স্থায়ী শান্তিতে পরিণত হচ্ছে না?
যুদ্ধবিরতি সাধারণত গোলাগুলি বা সামরিক অভিযান কমানোর ব্যবস্থা। কিন্তু স্থায়ী শান্তির জন্য রাজনৈতিক সমস্যাগুলির সমাধান প্রয়োজন।
প্রধান বাধাগুলি
১. নিরাপত্তা ও নিরস্ত্রীকরণ: ইজরায়েল হামাস ও হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা সীমিত করতে চায়। সংগঠনগুলি নিজেদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে।
২. প্যালেস্টাইনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা: সীমান্ত, জেরুজালেম, বসতি, শরণার্থী এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে সমঝোতা হয়নি।
৩. ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি: পরিদর্শন, নিষেধাজ্ঞা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলির মতপার্থক্য রয়েছে।
৪. লেবাননের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব: হিজবুল্লাহর অস্ত্র, লেবাননের সেনাবাহিনীর ক্ষমতা এবং দক্ষিণ সীমান্তে ইজরায়েলি বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে বিরোধ রয়েছে।
৫. ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ: হুথি ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং দেশের ঐক্য নিয়ে সমস্যা রয়েছে।
৬. পারস্পরিক অবিশ্বাস: অতীতের হামলা, জিম্মি, প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ ভবিষ্যৎ সমঝোতাকে কঠিন করে তোলে।
১৭. সম্ভাব্য শান্তির পথ কী?
কোনো একক চুক্তি দিয়ে এই সমস্ত সংঘাতের সমাধান সম্ভব নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য পৃথক ব্যবস্থা এবং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক কূটনৈতিক কাঠামো দরকার।
প্রথম ধাপ: যাচাইযোগ্য যুদ্ধবিরতি
গাজা, লেবানন এবং ইরান-সম্পর্কিত সংঘাতে হামলা বন্ধ, জিম্মি ও আটক ব্যক্তিদের প্রশ্নে সমঝোতা এবং যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
দ্বিতীয় ধাপ: মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন
খাদ্য, জল, ওষুধ, নিরাপদ আশ্রয় এবং শিক্ষাব্যবস্থা পুনরুদ্ধারকে সামরিক ও রাজনৈতিক দরকষাকষির বাইরে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তৃতীয় ধাপ: প্যালেস্টাইনি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
গ্রহণযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে কার্যকর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দরকার।
চতুর্থ ধাপ: আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তি
ইরান, ইজরায়েল, উপসাগরীয় রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক কর্মসূচি, সীমান্ত ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে যাচাইযোগ্য সমঝোতা দরকার।
দুই-রাষ্ট্র সমাধান—অর্থাৎ ইজরায়েল ও একটি স্বাধীন প্যালেস্টাইনি রাষ্ট্রের পাশাপাশি অস্তিত্ব—দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান প্রস্তাব। কিন্তু সীমান্ত, বসতি, জেরুজালেম, শরণার্থী এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে গভীর মতপার্থক্য থাকায় এটি বাস্তবায়নের পথ কঠিন।
একই সঙ্গে লেবাননের সার্বভৌমত্ব, ইয়েমেনের রাজনৈতিক সমাধান এবং ইরানের সঙ্গে নিরাপত্তা ও পারমাণবিক সমঝোতা পৃথকভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
এটি কি ধর্মযুদ্ধ, নাকি ভূরাজনৈতিক সংঘাত?
পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান সংঘাতকে শুধু ধর্মযুদ্ধ বলা ভুল; আবার ধর্মীয় পরিচয় ও ঐতিহাসিক স্মৃতির গুরুত্ব অস্বীকার করাও ভুল।
এখানে একসঙ্গে কাজ করছে—
ভূমি ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন।
জাতীয়তাবাদ ও ঐতিহাসিক স্মৃতি।
সামরিক নিরাপত্তা ও প্রতিরোধের কৌশল।
ইরান, ইজরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতার প্রতিযোগিতা।
জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা।
শরণার্থী, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন।
কোনো একটি পক্ষের ঘোষিত নিরাপত্তার দাবি অন্য পক্ষের নাগরিকদের অধিকারকে অগ্রাহ্য করার স্বয়ংক্রিয় অনুমতি দেয় না। একইভাবে, কোনো জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সশস্ত্র হামলায় বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করার বৈধতা দেয় না।
স্থায়ী শান্তির জন্য সামরিক উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকার, নাগরিক নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বাস্তব প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু সামরিক শক্তির ভারসাম্যের উপর নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলি কতটা গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছতে পারে তার উপরও।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত বোঝার জন্য বিভিন্ন সশস্ত্র ইসলামপন্থী সংগঠন, জাতীয়তাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত গোষ্ঠীকে আলাদা করে দেখা জরুরি। সব সংগঠনের লক্ষ্য, আদর্শ, কার্যপদ্ধতি বা আইনি অবস্থান এক নয়। কোনও সংগঠনকে কোনও দেশ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করলেও অন্য দেশের তালিকা বা অবস্থান আলাদা হতে পারে।
১. প্যালেস্টাইন, ইজরায়েল ও লেবানন অঞ্চল
সংগঠন | প্রধান কার্যক্ষেত্র | সংক্ষিপ্ত পরিচয় |
|---|---|---|
Hamas | গাজা ও প্যালেস্টাইন | ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ও সশস্ত্র আন্দোলন; ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর ইজরায়েল আক্রমণে নেতৃত্ব দেয়। |
Palestinian Islamic Jihad (PIJ) | গাজা ও প্যালেস্টাইন | প্যালেস্টিনীয় ইসলামপন্থী সশস্ত্র সংগঠন। |
Hezbollah | লেবানন | শিয়া রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগঠন; ইজরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাত রয়েছে। |
Popular Front for the Liberation of Palestine (PFLP) | প্যালেস্টাইন | বামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ প্যালেস্টিনীয় জাতীয়তাবাদী সংগঠন; সশস্ত্র শাখাও রয়েছে। |
Al-Aqsa Martyrs' Brigades | পশ্চিম তীর ও প্যালেস্টাইন | প্যালেস্টিনীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির একটি নেটওয়ার্ক। |
২. ইরাক, সিরিয়া ও বৃহত্তর জিহাদি নেটওয়ার্ক
সংগঠন | প্রধান কার্যক্ষেত্র | সংক্ষিপ্ত পরিচয় |
|---|---|---|
Islamic State (ISIS/ISIL/Daesh) | ইরাক ও সিরিয়া; বিভিন্ন দেশে শাখা | তথাকথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা জিহাদি সংগঠন; ব্যাপক বেসামরিক হত্যাকাণ্ডের জন্য পরিচিত। |
Al-Qaeda | আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক | আন্তর্জাতিক জিহাদি সংগঠন, যার বিভিন্ন আঞ্চলিক শাখা রয়েছে। |
Hayat Tahrir al-Sham (HTS) | সিরিয়া | সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে উঠে আসা ইসলামপন্থী সশস্ত্র সংগঠন; এর ঐতিহাসিক শিকড় আল-কায়েদার সিরীয় শাখার সঙ্গে যুক্ত। |
Kata'ib Hezbollah | ইরাক | ইরান-সমর্থিত বলে পরিচিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠী। |
Harakat al-Nujaba | ইরাক ও সিরিয়া | ইরান-ঘনিষ্ঠ ইরাকি সশস্ত্র সংগঠন। |
৩. ইয়েমেন ও আরব উপদ্বীপ
সংগঠন | প্রধান কার্যক্ষেত্র | সংক্ষিপ্ত পরিচয় |
|---|---|---|
Ansar Allah (Houthi movement) | ইয়েমেন ও লোহিত সাগর | ইয়েমেনের জায়দি শিয়া আন্দোলন ও সশস্ত্র শক্তি; লোহিত সাগরের জাহাজে হামলার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত। |
Al-Qaeda in the Arabian Peninsula (AQAP) | ইয়েমেন | আল-কায়েদার আঞ্চলিক শাখা। |
Islamic State–Yemen Province | ইয়েমেন | ইসলামিক স্টেটের ইয়েমেন-সংশ্লিষ্ট শাখা। |
৪. আফগানিস্তান ও পাকিস্তান অঞ্চল
সংগঠন | প্রধান কার্যক্ষেত্র | সংক্ষিপ্ত পরিচয় |
|---|---|---|
Tehrik-i-Taliban Pakistan (TTP) | পাকিস্তান | পাকিস্তান রাষ্ট্র ও নিরাপত্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান চালানো সংগঠন। |
Islamic State Khorasan Province (ISKP) | আফগানিস্তান ও আশপাশের অঞ্চল | ইসলামিক স্টেটের আঞ্চলিক শাখা; বেসামরিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার সঙ্গে যুক্ত। |
Lashkar-e-Taiba (LeT) | পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়া | দক্ষিণ এশিয়ার সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন; ভারতের বিরুদ্ধে হামলার সঙ্গে যুক্ত। |
Jaish-e-Mohammed (JeM) | পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়া | ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলার সঙ্গে যুক্ত জঙ্গি সংগঠন। |
Al-Qaeda in the Indian Subcontinent (AQIS) | দক্ষিণ এশিয়া | আল-কায়েদার দক্ষিণ এশীয় শাখা। |
৫. আফ্রিকার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সংগঠন
সংগঠন | প্রধান কার্যক্ষেত্র | সংক্ষিপ্ত পরিচয় |
|---|---|---|
Al-Shabaab | সোমালিয়া ও পূর্ব আফ্রিকা | আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র সংগঠন। |
Boko Haram | নাইজেরিয়া ও লেক চাদ অঞ্চল | ইসলামপন্থী জঙ্গি সংগঠন; বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা ও অপহরণের সঙ্গে যুক্ত। |
Jama'at Nusrat al-Islam wal-Muslimin (JNIM) | সাহেল অঞ্চল, পশ্চিম আফ্রিকা | আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র জোট। |
Islamic State in the Sahel Province | সাহেল অঞ্চল | ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক সশস্ত্র নেটওয়ার্ক। |
এই তালিকার কয়েকটি সংগঠন জাতিসংঘ বা বিভিন্ন দেশের সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। তবে প্রত্যেক সংগঠনের আইনি অবস্থান এক নয়—উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের তালিকা ও জাতিসংঘের ISIL/আল-কায়েদা নিষেধাজ্ঞার তালিকা একই নয়।
সশস্ত্র সংগঠন মানেই প্রতিটি ক্ষেত্রে একই আইনি সংজ্ঞায় সন্ত্রাসী সংগঠন নয়।
রাজনৈতিক শাখা ও সশস্ত্র শাখা একই সংগঠনের অংশ হলেও বিভিন্ন দেশের আইন তাদের আলাদাভাবে বিবেচনা করতে পারে।
ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী এবং আল-কায়েদা/ইসলামিক স্টেটের মতো জিহাদি সংগঠন এক ধরনের নেটওয়ার্ক নয়; তাদের আদর্শ, লক্ষ্য ও পারস্পরিক সম্পর্কেও পার্থক্য আছে।
তথ্যসূত্র ও আরও পড়ুন
1. United Nations — প্যালেস্টাইন প্রশ্নের ঐতিহাসিক পটভূমি।
2. Council on Foreign Relations — ইজরায়েল–প্যালেস্টাইন সংঘাতের পটভূমি ও বর্তমান পরিস্থিতি।
3. United Nations Office for the Coordination of Humanitarian Affairs — গাজা ও পশ্চিম তীরের মানবিক পরিস্থিতি, ১৫ অক্টোবর ২০২৬।
4. UK House of Commons Library — ইজরায়েল–হিজবুল্লাহ সংঘাত ও লেবাননের পরিস্থিতি, ২০২৬।
5. Council on Foreign Relations — ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা।
6. Council on Foreign Relations — ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ ও লোহিত সাগরের সংঘাত।
7. International Court of Justice — অধিকৃত প্যালেস্টাইনি ভূখণ্ড সম্পর্কে ২০২৪ সালের পরামর্শমূলক মতামতের সারাংশ।
সরকারি যাচাইয়ের জন্য দেখুন: জাতিসংঘের ISIL ও আল-কায়েদা নিষেধাজ্ঞার তালিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকা-সংক্রান্ত তথ্য।
সম্পাদকীয় নোট: প্রতিবেদনটি ২৫ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত উপলভ্য তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত। সংঘাতের পরিস্থিতি দ্রুত বদলায়; হতাহতের সংখ্যা, যুদ্ধবিরতির অবস্থা এবং রাজনৈতিক সমঝোতা প্রকাশের আগে সর্বশেষ সরকারি ও জাতিসংঘের প্রতিবেদন দিয়ে পুনরায় যাচাই করা উচিত।
Official Editorial PDF Edition
Verified PublicationDownload a clean, high-resolution printable copy complete with tables, formulas, and high-res photography. Free for registered readers.
Community Feedback & Editorial Ratings
All Reader Reviews (0)
No reader reviews yet for this story.
Be the first to share your rating and perspective!















