স্বাধীন ভারতের মানচিত্র পুনর্গঠন: ১৯৪৭ থেকে বর্তমান পর্যন্ত রাজ্য গঠন, নাম পরিবর্তন ও সংযুক্তিকরণের ঐতিহাসিক ইতিবৃত্ত
দেশীয় রাজ্যের অন্তর্ভুক্তি, ফজল আলি কমিশন এবং রাজ্যগুলির সীমানা ও নাম বদলের ধারাবাহিক ঐতিহাসিক দলিল

আধুনিক ভারতের ভৌগোলিক রূপরেখার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের সময় বর্তমান রূপের ভারত মানচিত্রে বিদ্যমান ছিল না। সে সময় ভারত মূলত ব্রিটিশ শাসিত প্রদেশ এবং প্রায় ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্য বা প্রিন্সলি স্টেটে বিভক্ত ছিল। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং ভি. পি. মেননের কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক দৃঢ়তার মাধ্যমে অধিকাংশ দেশীয় রাজ্য ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হলেও একাধিক অঞ্চল যুক্ত করতে বহুমুখী সাংবিধানিক, সামরিক ও গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল।
স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনে রাজ্যগুলির সীমানা ও নাম বদলের এক গতিশীল প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১ থেকে ৪ পর্যন্ত ধারাগুলি ভারতীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ড নির্ধারণ এবং সংসদকে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নতুন রাজ্য গঠন বা সীমানা পরিবর্তনের অভূতপূর্ব ক্ষমতা প্রদান করেছে।
সংকটপূর্ণ দেশীয় রাজ্যের অন্তর্ভুক্তি: জুনাগড়, কাশ্মীর ও গোয়া
১. জুনাগড় অন্তর্ভুক্তি (১৯৪৭-১৯৪৮)
সৌরাষ্ট্রের জুনাগড়ের নবাব মুহম্মদ মহাবত খানজি ১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্তির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তবে ওই রাজ্যের সিংহভাগ নাগরিক ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এর ফলে স্থানীয় স্তরে তীব্র জনরোষ ও গণবিক্ষোভ শুরু হয়। ভারত সরকার সামরিক অবরোধ তৈরি করে এবং ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি গণভোট (Plebiscite) অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে ৯৯ শতাংশেরও বেশি মানুষ ভারতের পক্ষে মত দেন এবং জুনাগড় আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতে যুক্ত হয়।
২. জম্মু ও কাশ্মীর অন্তর্ভুক্তি (১৯৪৭)
জম্মু ও কাশ্মীরের তৎকালীন মহারাজা হরি সিং শুরুতে স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তান সমর্থিত সশস্ত্র উপজাতীয় হানাদার বাহিনী রাজ্যে আক্রমণ চালালে মহারাজা ভারতের সামরিক সহায়তা চান। ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭ সালে তিনি ঐতিহাসিক 'ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন' (Instrument of Accession)-এ স্বাক্ষর করেন। ভারতীয় সেনা শ্রীনগরে পৌঁছে আক্রমণকারীদের প্রতিহত করে এবং কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
৩. গোয়া মুক্তি ও অন্তর্ভুক্তি (১৯৬১)
ব্রিটিশরা ভারত ছাড়লেও পর্তুগিজরা গোয়া, দমন ও দিউ ছাড়তে অস্বীকার করে। দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনার ব্যর্থতার পর ভারত সরকার ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরে 'অপারেশন বিজয়' পরিচালনা করে। পর্তুগিজ গভর্নর ম্যানুয়েল আন্তোনিও ভ্যাসালো ই সিলভা আত্মসমর্পণ করেন এবং গোয়া কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীকালে ১৯৮৭ সালে গোয়া পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা লাভ করে।
"ভারতীয় ভূখণ্ডের ঐক্য ও অখণ্ডতা কেবল মানচিত্রের দাগ নয়; এটি প্রতিটি ভাষা, সংস্কৃতি ও অঞ্চলের পারস্পরিক ঐকমত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক জীবন্ত সাংবিধানিক দর্শন।"
রাজ্য পুনর্গঠন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কমিশনসমূহ
ভাষাগত ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনের দাবি স্বাধীনতার পরপরই তীব্র আকার ধারণ করে। এই দাবি খতিয়ে দেখতে কেন্দ্র সরকার একাধিক কমিশন গঠন করে:
এস. কে. ধর কমিশন (১৯৪৮): সংবিধান সভা কর্তৃক গঠিত এই কমিশন ভাষার বদলে ভৌগোলিক সংলগ্নতা, আর্থিক স্বনির্ভরতা ও প্রশাসনিক সুবিধার ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনের পরামর্শ দেয়।
জেভিপি কমিটি (JVP Committee, ১৯৪৮-৪৯): জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল ও পট্টভি সীতারামাইয়াকে নিয়ে গঠিত এই কমিটি তৎকালীন নিরাপত্তা ও ঐক্যের স্বার্থে ভাষাগত রাজ্য গঠনের দাবি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার প্রস্তাব করে।
ফজল আলি কমিশন / রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (১৯৫৩): পোট্টি শ্রীরামালুর অনশন ও মৃত্যুর পর ১৯৫৩ সালে তেলুগুভাষীদের জন্য পৃথক 'অন্ধ্র রাজ্য' গঠিত হয়। ফলে সারা দেশে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সরকার বিচারপতি ফজল আলির নেতৃত্বে, কে. এম. পানিক্কর ও এইচ. এন. কুঞ্জরুকে নিয়ে 'স্টেটস রিঅর্গানাইজেশন কমিশন' (SRC) গঠন করে। এই কমিশনের সুপারিশ মেনেই ১৯৫৬ সালে 'রাজ্য পুনর্গঠন আইন' এবং সপ্তম সংবিধান সংশোধনী কার্যকর হয়। এর ফলে পূর্বের Part-A, B, C, D শ্রেণিবিভাগ বিলুপ্ত করে ১৪টি রাজ্য এবং ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সৃষ্টি করা হয়।
কালানুক্রমিক রাজ্য গঠন ও পুনর্গঠন (১৯৫৩–বর্তমান)
১৯৫৩: মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি ভেঙে প্রথম ভাষাতাত্ত্বিক রাজ্য হিসেবে অন্ধ্র রাজ্যের জন্ম।
১৯৬০: দ্বিভাষিক বোম্বে রাজ্য দ্বিখণ্ডিত হয়ে গুজরাত ও মহারাষ্ট্র গঠিত হয়।
১৯৬৩: আসাম থেকে পৃথক করে নাগাল্যান্ডকে পৃথক রাজ্য করা হয়।
১৯৬৬: পঞ্জাব পুনর্গঠন আইনের মাধ্যমে পঞ্জাব ভেঙে হরিয়ানা গঠিত হয় এবং চণ্ডীগড় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষিত হয়। হিমাচল অঞ্চলকে কেন্দ্রশাসিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয় (পরে ১৯৭১ সালে পূর্ণ রাজ্য)।
১৯৭২: উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পুনর্গঠন আইনের মাধ্যমে মেঘালয়, মণিপুর ও ত্রিপুরা পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা পায়।
১৯৭৫: গণভোট ও ৩৬তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে রাজতন্ত্র বিলোপ করে সিকিম ভারতের ২২তম রাজ্যে পরিণত হয়।
১৯৮৭: মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশ এবং গোয়া পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা পায়।
২০০০: তিনটি প্রধান রাজ্য বিভক্ত হয়— মধ্যপ্রদেশ ভেঙে ছত্তিশগড়, উত্তরপ্রদেশ ভেঙে উত্তরাঞ্চল (বর্তমানে উত্তরাখণ্ড), এবং বিহার ভেঙে ঝাড়খণ্ড গঠিত হয়।
২০১৪: অন্ধ্রপ্রদেশ ভেঙে ভারতের ২৯তম রাজ্য হিসেবে তেলঙ্গানা আত্মপ্রকাশ করে।
২০১৯: জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন আইনের মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য ভেঙে জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ নামে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠিত হয়।
২০২০: দাদরা ও নগর হাভেলি এবং দমন ও দিউকে একত্রিত করে একক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তরিত করা হয়।
ভারতীয় রাজ্যগুলির নাম পরিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণী
স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে ঔপনিবেশিক প্রভাব মুছে ফেলতে এবং আঞ্চলিক ভাষাগত আত্মপরিচয়কে মর্যাদা দিতে একাধিক রাজ্যের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে:
পূর্বতন নাম | পরিবর্তিত নতুন নাম | কার্যকরের বছর | আইন বা সাংবিধানিক পদক্ষেপ |
|---|---|---|---|
ইউনাইটেড প্রভিন্সেস (United Provinces) | উত্তরপ্রদেশ (Uttar Pradesh) | ১৯৫০ | ইউনাইটেড প্রভিন্সেস (অলটারেশন অফ নেম) অর্ডার, ১৯৫০ |
হায়দরাবাদ / অন্ধ্র রাজ্য | অন্ধ্রপ্রদেশ (Andhra Pradesh) | ১৯৫৬ | স্টেটস রিঅর্গানাইজেশন অ্যাক্ট, ১৯৫৬ |
মাদ্রাজ (Madras State) | তামিলনাড়ু (Tamil Nadu) | ১৯৬৯ | মাদ্রাজ স্টেট (অলটারেশন অফ নেম) অ্যাক্ট, ১৯৬৮ |
মহীশূর (Mysore) | কর্ণাটক (Karnataka) | ১৯৭৩ | মহীশূর স্টেট (অলটারেশন অফ নেম) অ্যাক্ট, ১৯৭৩ |
লাক্ষাদ্বীপ, মিনিকয় ও আমিনিদিভি দ্বীপপুঞ্জ | লক্ষদ্বীপ (Lakshadweep) | ১৯৭৩ | লাক্ষাদ্বীপ (অলটারেশন অফ নেম) অ্যাক্ট, ১৯৭৩ |
উত্তরাঞ্চল (Uttaranchal) | উত্তরাখণ্ড (Uttarakhand) | ২০০৭ | উত্তরাঞ্চল (অলটারেশন অফ নেম) অ্যাক্ট, ২০০৬ |
পন্ডিচেরি (Pondicherry) | পুদুচেরি (Puducherry) | ২০০৬ | পন্ডিচেরি (অলটারেশন অফ নেম) অ্যাক্ট, ২০০৬ |
উড়িষ্যা (Orissa) | ওড়িশা (Odisha) | ২০১১ | ওড়িশা (অলটারেশন অফ নেম) অ্যাক্ট ও ১১৩তম সংবিধান সংশোধনী |
ভারতের ফেডারেল পরিকাঠামো অনমনীয় কোনো কাঠামো নয়; বরং এটি সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভারসাম্য রক্ষায় পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালের খণ্ডবিখণ্ড অঞ্চল থেকে শুরু করে আজকের সুসংগঠিত শাসনব্যবস্থা প্রমাণ করে ভারতীয় সংবিধানের অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা ও সংহতির শক্তি।
Official Editorial PDF Edition
Verified PublicationDownload a clean, high-resolution printable copy complete with tables, formulas, and high-res photography. Free for registered readers.
Community Feedback & Editorial Ratings
All Reader Reviews (0)
No reader reviews yet for this story.
Be the first to share your rating and perspective!














