দুর্গাপুজো, দুর্গোৎসব, শারদোৎসব, শারদীয়: শব্দের ইতিহাস ও পরিচয়ের রাজনীতি
পুরনো বাংলা পত্রপত্রিকা, শব্দের অর্থ এবং ঐতিহাসিক নথির আলোকে উৎসবের ভাষা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের অনুসন্ধান।

দুর্গাপুজো, দুর্গোৎসব, শারদোৎসব, শারদীয়: শব্দের ইতিহাস, বাঙালির সংস্কৃতি ও পরিচয়ের রাজনীতি
যে উৎসবের ভাষা শতাব্দী ধরে ধর্ম, সাহিত্য ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে বদলেছে, তাকে ঘিরে আজ রাজনৈতিক পরিচয়ের লড়াই কেন? পুরনো পত্রপত্রিকা, শব্দের অর্থ এবং ইতিহাসের নথি কী বলছে?
১. শব্দ বদলালেই কি উৎসবের পরিচয় বদলে যায়?
দুর্গাপুজো বলব, দুর্গোৎসব বলব, শারদোৎসব বলব, নাকি শারদীয়—এই প্রশ্নগুলি ভাষার আলোচনায় স্বাভাবিক। কিন্তু যখন কোনও শব্দের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে মানুষকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরে ভাগ করা হয়, তখন ভাষার প্রশ্নটি আর শুধু ভাষার থাকে না। তা হয়ে ওঠে সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের বিতর্ক।
এই বিতর্কের মধ্যে একটি মৌলিক প্রশ্ন হারিয়ে যায়: শব্দগুলির প্রকৃত অর্থ কী, তাদের ইতিহাস কী, আর তাদের ব্যবহার বদলানোর পিছনে কী প্রমাণ রয়েছে?
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ‘দুর্গাপুজো → দুর্গোৎসব → শারদোৎসব → শারদীয়’—এই ধারাবাহিক ক্রমে একটি শব্দকে অন্য শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল, এমন কোনও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বরং শব্দগুলি ভিন্ন অর্থ ও প্রসঙ্গে পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়েছে। পুরনো বাংলা সাহিত্যে ‘দুর্গোৎসব’-এর ব্যবহার যেমন দেখা যায়, তেমনই ‘শারদীয়’ শব্দটি পত্রপত্রিকা ও ঋতুভিত্তিক প্রকাশনার সঙ্গে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়েছে।
তাই এই শব্দগুলিকে ঘিরে রাজনৈতিক অভিযোগ তোলার আগে প্রয়োজন ইতিহাসের নথি, ভাষার ব্যুৎপত্তি এবং পত্রপত্রিকার পুরনো সংখ্যার পরীক্ষা।
২. চারটি শব্দের অর্থ: কোথায় পার্থক্য?
দুর্গাপুজো
দেবী দুর্গার আরাধনা ও তার সঙ্গে যুক্ত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সরাসরি নাম। বাংলার কথ্য ভাষায় ‘দুর্গাপুজো’ সবচেয়ে পরিচিত শব্দগুলির একটি। এর মধ্যে পূজার ধর্মীয় অর্থ স্পষ্টভাবে উপস্থিত।
দুর্গোৎসব
‘দুর্গা’ ও ‘উৎসব’—দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত শব্দ। এটি পূজার আচার ছাড়াও সমগ্র উৎসব, সামাজিক সমাগম, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং জনজীবনের উদ্যাপনকে বোঝাতে পারে। ধর্মীয় অর্থ এখানে অক্ষুণ্ণ থাকে, কিন্তু উৎসবের ব্যাপ্তিও সামনে আসে।
শারদোৎসব
‘শারদ’ অর্থ শরৎকাল-সম্পর্কিত, আর ‘উৎসব’ অর্থ উদ্যাপন। শব্দটি শরৎকালের উৎসবকে বোঝায়। বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরে এটি দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হয়। তবে শব্দটির আক্ষরিক অর্থ শুধু দুর্গাপুজোতেই সীমাবদ্ধ নয়।
শারদীয়
অর্থ শরৎকালীন বা শরৎ-সম্পর্কিত। যেমন, ‘শারদীয় সংখ্যা’, ‘শারদীয় সাহিত্য’ কিংবা ‘শারদীয় শুভেচ্ছা’। বাংলা প্রকাশনা ও সাহিত্যজগতে শব্দটি বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে। এটি নিজে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার বা রাজনৈতিক মতাদর্শের নাম নয়।
এই পার্থক্যগুলি বুঝলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়: ‘দুর্গাপুজো’ মূলত দেবীর আরাধনাকে সরাসরি নির্দেশ করে, ‘দুর্গোৎসব’ পূজা ও উৎসবের বৃহত্তর পরিসরকে বোঝাতে পারে, ‘শারদোৎসব’ ঋতুভিত্তিক সাংস্কৃতিক অর্থ বহন করে এবং ‘শারদীয়’ একটি বিশেষণ।
এগুলি পরস্পরের বিকল্প হিসেবে কোনও কোনও প্রসঙ্গে ব্যবহার করা সম্ভব, কিন্তু সব প্রসঙ্গে শব্দগুলির অর্থ সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়।
৩. পুরনো পত্রপত্রিকা কী বলছে? ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তারিখ
এই বিতর্কে সংবাদপত্রের ভূমিকা বোঝার জন্য দুটি বিষয় আলাদা করা দরকার: দুর্গাপুজোর নামের ইতিহাস এবং দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে সাহিত্য প্রকাশের ইতিহাস।
প্রকাশনার ইতিহাস সম্পর্কে কিছু নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়।
১৮৭৩ ‘ছুটির সুলভ’ — সুলভ সমাচার
আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত ২০২৫ সালের একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, কেশবচন্দ্র সেনের ইন্ডিয়ান রিফর্ম অ্যাসোসিয়েশনের সাপ্তাহিক সুলভ সমাচার ১৮৭৩ সালে ‘ছুটির সুলভ’ নামে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। এটি দুর্গাপুজোর সময়কে কেন্দ্র করে বিশেষ প্রকাশনার প্রাথমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
১৮৯২ -সাধনা পত্রিকার ভাদ্র-আশ্বিন সংখ্যা
একই প্রতিবেদনে ১৮৯২ সালের সাধনা পত্রিকার ভাদ্র-আশ্বিন সংখ্যাকে পূজাবার্ষিকীর একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরি বলা হয়েছে। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্বর্ণমৃগ’ গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তাঁর লেখায় ‘দুর্গোৎসব’ শব্দের ব্যবহারও পাওয়া যায়। অর্থাৎ শব্দটি বিশ শতকের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কের বহু আগেই বাংলা সাহিত্যিক ব্যবহারে উপস্থিত ছিল।
১৯১৮ পার্বণী: পূজাবার্ষিকীর সাহিত্যিক ধারা
বাংলা পঞ্জিকার ১৩২৫ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত পার্বণী পত্রিকার শারদীয় সংখ্যার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক যোগের কথা ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাঁর গান ‘শরতে আজ কোন অতিথি এল প্রাণের দ্বারে’ প্রকাশিত হয়েছিল। এটি দেখায়, ‘শারদীয়’ শব্দের ব্যবহার সাহিত্য ও ঋতুভিত্তিক প্রকাশনার পরিসরে বিকশিত হয়েছে।
১৯২৬ আনন্দবাজার পত্রিকার শারদীয় সংখ্যা
আনন্দবাজার পত্রিকার নিজস্ব ঐতিহাসিক নিবন্ধে ১৯২৬ সালে তাদের প্রথম শারদীয় সংখ্যার প্রকাশের কথা বলা হয়েছে। এর আগে থেকেই অন্য পত্রিকা ও সাময়িকীতে পুজো উপলক্ষে সাহিত্য প্রকাশের নজির ছিল।
এই তারিখগুলি থেকে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়?
এগুলি থেকে বলা যায়, দুর্গাপুজোকে ঘিরে বাংলা মুদ্রণসংস্কৃতি উনিশ শতক থেকেই বিকশিত হচ্ছিল। ধীরে ধীরে উৎসব, সাহিত্য, অবকাশ, পারিবারিক জীবন এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়।
কিন্তু এই তারিখগুলি থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় না যে কোনও একটি সংবাদপত্র ‘দুর্গাপুজো’ শব্দ বাদ দিয়ে প্রথম ‘দুর্গোৎসব’ চালু করেছিল, অথবা কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ‘শারদোৎসব’ কিংবা ‘শারদীয়’ শব্দকে তার বিকল্প করেছিল।
এমন দাবি প্রমাণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট পত্রিকার নির্দিষ্ট তারিখের সংখ্যা, সম্পাদকীয় নির্দেশ, শিরোনাম, প্রকাশনার বিজ্ঞাপন কিংবা সম্পাদকীয় চিঠিপত্র দেখাতে হবে। বর্তমানে পাওয়া সূত্রগুলিতে সেই ধরনের পূর্ণ প্রমাণ নেই।
৪. সর্বজনীন দুর্গাপুজো: ধর্মীয় আচার থেকে সামাজিক উৎসবের বিস্তার
শব্দের ইতিহাস বোঝার পাশাপাশি উৎসবের সামাজিক ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় বাংলার বহু বড় দুর্গাপুজো জমিদার ও ধনী পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত হতো। পরবর্তী সময়ে বারোয়ারি এবং সর্বজনীন পুজোর বিকাশের মাধ্যমে পুজো আরও বৃহত্তর জনসমাজের অংশ হয়ে ওঠে।
ভারতের ২০০১ সালের জনগণনার কলকাতা জেলা-সংক্রান্ত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, বারোয়ারি পুজোর ধারার সঙ্গে যুক্ত সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় ছিল ১৯১০ সালের কলকাতা। ওই বিবরণে বারোয়ারি থেকে ‘সর্বজনীন’ শব্দের ব্যবহারে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে এই বর্ণনাকে শব্দের সর্বভারতীয় প্রথম ব্যবহার বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়; এটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের বিবরণ।
এই পরিবর্তনের তাৎপর্য ছিল সামাজিক অংশগ্রহণের প্রসার। পুজো শুধু কোনও একটি পরিবারের আয়োজন না থেকে পাড়ার মানুষ, স্থানীয় সংগঠন, শিল্পী, কারিগর এবং দর্শনার্থীদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
আজকের দুর্গাপুজোয় ধর্মীয় আচার যেমন আছে, তেমনই আছে শিল্প, মণ্ডপনির্মাণ, আলোকসজ্জা, সাহিত্য, সংগীত, অর্থনীতি এবং সামাজিক মিলন। ইউনেস্কো ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজোকে Intangible Cultural Heritage of Humanity তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ইউনেস্কোর বিবেচনায় এই উৎসবের সঙ্গে শিল্পী, কারিগর, সম্প্রদায় এবং শহরের সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন নিবিড়ভাবে যুক্ত।
এই ইতিহাস থেকে বোঝা যায়, উৎসবের সামাজিক পরিসর বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু সেই বিস্তার ধর্মীয় পরিচয় মুছে দিয়েছে, এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। ধর্মীয় আচার এবং বৃহত্তর সাংস্কৃতিক উদ্যাপন একই উৎসবের মধ্যে পাশাপাশি থাকতে পারে।
৫. তাহলে শব্দ নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয় কেন?
ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি পরিচয় প্রকাশেরও মাধ্যম। একটি শব্দ কখনও কোনও সম্প্রদায়ের কাছে ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতীক, অন্য কারও কাছে সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির প্রতীক, আবার রাজনৈতিক সংগঠনের কাছে জনসমর্থন তৈরির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
দুর্গাপুজোকে ঘিরে ‘দুর্গাপুজো’ বনাম ‘শারদোৎসব’ ধরনের বিতর্কের সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর বাংলা সংস্করণে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দুর্গাপুজোর সময় বইয়ের স্টল ভাঙচুরের অভিযোগের পাশাপাশি এই নামকরণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের উল্লেখ রয়েছে।
তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি: কোনও সংবাদ প্রতিবেদনে বিতর্কের উল্লেখ থাকা আর কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল পরিকল্পিতভাবে শব্দ বদলে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে—এই দুই দাবি এক নয়। দ্বিতীয় দাবির জন্য পৃথক ও নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।
শব্দের রাজনীতি সাধারণত কয়েকটি পথে কাজ করতে পারে।
পরিচয়ের সংকেত: একটি শব্দ ব্যবহার করে কেউ নিজের ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক অবস্থান প্রকাশ করতে পারেন।
প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করা: অন্য শব্দ ব্যবহারকারীকে ভুল, বিরোধী বা সংস্কৃতিবিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হতে পারে।
আবেগের ব্যবহার: দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত কোনও শব্দ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তা মানুষের আবেগকে দ্রুত সক্রিয় করতে পারে।
মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরানো: উৎসবের নিরাপত্তা, শিল্পীদের পারিশ্রমিক, স্থানীয় মানুষের অসুবিধা, পরিবেশ এবং সরকারি অর্থের স্বচ্ছতার মতো প্রশ্ন আড়ালে চলে যেতে পারে।
এই প্রক্রিয়াগুলি রাজনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাব্য কৌশল। কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট ঘটনায় এগুলি ঘটেছে কি না, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য, প্রচারসামগ্রী, সংগঠনের নথি এবং ঘটনাক্রম পরীক্ষা করতে হবে।
৬. সংবাদপত্র কি শব্দ বদলে দিয়েছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে ইতিহাসের প্রমাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
যে নথিগুলি পাওয়া গেছে, সেগুলি দেখায় যে বাংলা সংবাদপত্র ও সাময়িকী দুর্গাপুজোর সাংস্কৃতিক ইতিহাস নির্মাণে বড় ভূমিকা নিয়েছে। সুলভ সমাচার, সাধনা, পার্বণী, বসুমতী এবং আনন্দবাজার পত্রিকা—বিভিন্ন সময়ে পুজো উপলক্ষে সাহিত্য ও বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। এর ফলে ‘শারদীয়’ শব্দটি সাহিত্য ও প্রকাশনার জগতে একটি পরিচিত অর্থ অর্জন করেছে।
কিন্তু সংবাদপত্রগুলি সম্মিলিতভাবে কোনও এক নির্দিষ্ট সময়ে ‘দুর্গাপুজো’ শব্দকে বাদ দিয়ে ‘দুর্গোৎসব’ বা ‘শারদোৎসব’ চালু করেছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
শব্দের ব্যবহারকে প্রভাবিত করতে পারে সাহিত্য, ধর্মীয় প্রথা, সম্পাদকীয় রীতি, বিজ্ঞাপন, প্রকাশনার বাজার এবং সামাজিক পরিবর্তন। নির্দিষ্ট পত্রিকা কীভাবে শব্দ ব্যবহার করেছে, তা জানতে হলে তার পুরনো সংখ্যা বছর ধরে পরীক্ষা করতে হবে। এক-দুটি আধুনিক প্রতিবেদন থেকে কোনও শব্দের প্রথম ব্যবহার বা পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট সাল নির্ধারণ করা যায় না।
সুতরাং এখানে সংবাদমাধ্যমের ঐতিহাসিক ভূমিকা স্বীকার করা উচিত, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কোনও সংবাদপত্রকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভাষা বদলের দায় দেওয়া উচিত নয়।
৭. রাজনৈতিক বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে ইতিহাস কীভাবে কাজে লাগতে পারে?
রাজনৈতিক বিতর্কে কোনও শব্দের ব্যবহার দেখলেই তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়। বরং কয়েকটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন।
1. শব্দটির অভিধানগত অর্থ কী?
2. পুরনো সাহিত্য ও পত্রিকায় শব্দটি কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে?
3. শব্দটির ব্যবহার বদলের নির্দিষ্ট সাল বা ঘটনা সম্পর্কে কোনও সমসাময়িক নথি রয়েছে কি?
4. কোনও রাজনৈতিক দল বা নেতা কি নিজের বক্তব্যে শব্দটিকে বিশেষ অর্থ দিয়েছেন? দিলে সেই বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট কী?
5. শব্দ নিয়ে বিতর্কের ফলে বাস্তবে কোনও নীতি, সরকারি সিদ্ধান্ত বা নাগরিক অধিকার প্রভাবিত হয়েছে কি?
এই প্রশ্নগুলি করলে রাজনৈতিক প্রচার ও ঐতিহাসিক প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য করা সহজ হয়।
একটি শব্দ পছন্দ করা বা অন্য শব্দ ব্যবহার করা নিজে থেকেই কারও রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রমাণ করে না। যেমন, ‘শারদীয়’ বললেই কেউ ধর্মীয় আচার থেকে দূরে সরে গেলেন—এমন নয়। আবার ‘দুর্গাপুজো’ বললেই কেউ কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতের সমর্থক—এমন সিদ্ধান্তও যুক্তিসঙ্গত নয়।
মানুষের ভাষা অনেক সময় তার পারিবারিক অভ্যাস, আঞ্চলিক ব্যবহার, সাহিত্যপ্রীতি কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দের প্রতিফলন। প্রতিটি শব্দকে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করলে ভাষার স্বাভাবিক বৈচিত্র্যই সংকুচিত হয়।
শব্দের লড়াই নয়, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা
দুর্গাপুজো, দুর্গোৎসব, শারদোৎসব এবং শারদীয়—এই শব্দগুলি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন স্তরকে সামনে আনে। একটির মধ্যে ধর্মীয় আরাধনার প্রত্যক্ষতা, অন্যটির মধ্যে উৎসবের ব্যাপ্তি, আরেকটির মধ্যে শরৎকালের সাংস্কৃতিক আবহ এবং অন্যটির মধ্যে ঋতুভিত্তিক সাহিত্যিক পরিচয় স্পষ্ট হতে পারে।
ইতিহাসের নথি দেখায়, উনিশ শতক থেকেই বাংলা পত্রপত্রিকা পুজোকে কেন্দ্র করে বিশেষ প্রকাশনা ও সাহিত্যচর্চা গড়ে তুলেছে। বিশ শতকের প্রথমার্ধে এই ধারা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু এই ইতিহাস কোনও সরল শব্দ-প্রতিস্থাপনের গল্প নয়।
তাই রাজনৈতিক উত্তেজনার সময়ে সবচেয়ে জরুরি হলো শব্দের ব্যবহারকে ইতিহাসের নথি দিয়ে যাচাই করা। কোনও শব্দকে ‘আসল’ আর অন্যটিকে ‘চক্রান্ত’ বলার আগে তার পক্ষে প্রমাণ হাজির করা প্রয়োজন। একইভাবে, কোনও রাজনৈতিক দল বা সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরিবর্তনের অভিযোগ তুললে সেই অভিযোগের নির্দিষ্ট নথিও দেখাতে হবে।
উৎসবের ভাষা নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু আলোচনা যেন মানুষের সাংস্কৃতিক অধিকারকে সংকুচিত না করে এবং ঐতিহাসিক সত্যকে রাজনৈতিক স্লোগানের অধীন না করে।
সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা মানে শুধু একটি শব্দ আঁকড়ে থাকা নয়; সেই শব্দের ইতিহাস, বহুমাত্রিক অর্থ এবং মানুষের মধ্যে তার জীবন্ত ব্যবহারের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকা।
নির্বাচিত তথ্যসূত্র
অতনু বিশ্বাস, “সেই জাদু, আজও”, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫। প্রতিবেদনটি পড়ুন।
আনন্দবাজার পত্রিকা, “আশ্বিন এলেই আনন্দের জোয়ার শারদ-সংখ্যায়”, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫। প্রতিবেদনটি পড়ুন।
ভারতের জনগণনা, কলকাতা জেলা সংক্রান্ত বিবরণ, ২০০১। PDF।
UNESCO, Durga Puja in Kolkata. সরকারি ঐতিহ্য-নথি।
Indian Express বাংলা, দুর্গাপুজোর সময় বইয়ের স্টল ভাঙচুরের অভিযোগ ও নামকরণ নিয়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি পড়ুন।
Official Editorial PDF Edition
Verified PublicationDownload a clean, high-resolution printable copy complete with tables, formulas, and high-res photography. Free for registered readers.
Community Feedback & Editorial Ratings
All Reader Reviews (0)
No reader reviews yet for this story.
Be the first to share your rating and perspective!














