CPI(M) কেন BJP-কে হিন্দুত্ববাদী বলে? ইতিহাস, রাজনৈতিক কৌশল ও বামপন্থার স্বার্থের অনুসন্ধান
সাভারকর ও RSS-এর ইতিহাস থেকে CPI(M)-এর নির্বাচনী কৌশল—হিন্দুত্বের বিরোধিতা কি আদর্শ, রাজনৈতিক পরিচয়, নাকি ভোটের হিসাব?

CPI(M) কেন BJP-কে হিন্দুত্ববাদী বলে? ইতিহাস, রাজনৈতিক কৌশল ও বামপন্থার স্বার্থের অনুসন্ধান
সাভারকর ও RSS-এর ইতিহাস থেকে CPI(M)-এর নির্বাচনী কৌশল—হিন্দুত্বের বিরোধিতা কি শুধুই আদর্শগত অবস্থান, নাকি এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয় রক্ষা ও ভোটের হিসাবও?
একটি রাজনৈতিক শব্দের পিছনে কী আছে?
ভারতীয় রাজনীতিতে BJP-কে ‘হিন্দুত্ববাদী’ বলা এখন খুব পরিচিত ঘটনা। CPI(M), CPI এবং অন্যান্য বামপন্থী দল প্রায়ই এই শব্দ ব্যবহার করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, BJP-কে হিন্দুত্ববাদী বলার ঐতিহাসিক ভিত্তি কী? CPI(M) কেন এই বিষয়টিকে এত গুরুত্ব দেয়? এবং এই বিরোধিতা থেকে বামপন্থী দলটির রাজনৈতিক লাভ কী হতে পারে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গেলে দুটি বিষয় একসঙ্গে মনে রাখতে হবে। প্রথমত, BJP-র আদর্শ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি সম্পর্কে ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের আদর্শগত অবস্থানকে নির্বাচনী সমর্থন, সংগঠনের পরিচয় এবং বিরোধীদের থেকে নিজেদের পৃথক করার জন্যও ব্যবহার করে।
তাই CPI(M)-এর প্রতিটি বক্তব্যকে অন্ধভাবে সত্য বলে মেনে নেওয়া যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনই তার হিন্দুত্ববিরোধিতাকে নিছক ভোটের রাজনীতি বলে উড়িয়ে দেওয়াও তথ্যসম্মত নয়।
১. হিন্দুত্বের ইতিহাস: ধর্মীয় পরিচয় থেকে রাজনৈতিক মতাদর্শ
‘হিন্দুধর্ম’ এবং ‘হিন্দুত্ব’ একই অর্থ বহন করে না।
হিন্দুধর্মের মধ্যে রয়েছে বহু দর্শন, উপাসনাপদ্ধতি, আচার, আঞ্চলিক ঐতিহ্য ও সামাজিক অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে, আধুনিক রাজনৈতিক হিন্দুত্ব ভারতীয় জাতি, রাষ্ট্র এবং জাতীয় পরিচয়কে হিন্দু সভ্যতাগত পরিচয়ের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত করে।
বিনায়ক দামোদর সাভারকর ১৯২৩ সালে প্রকাশিত Essentials of Hindutva গ্রন্থে এই রাজনৈতিক ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক কাঠামো তুলে ধরেন। তাঁর সংজ্ঞায়, ভারতের ভূখণ্ডকে পিতৃভূমি এবং পবিত্রভূমি হিসেবে দেখার বিষয়টি হিন্দু পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই সংজ্ঞার ফলে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের জাতীয় পরিচয় নিয়ে একটি পৃথক প্রশ্ন তৈরি হয়, কারণ তাঁদের ধর্মীয় পবিত্রভূমির কেন্দ্র ভারতের বাইরে।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে প্রকাশিত ইতিহাসবিদ মঞ্জরী কাটজুর গবেষণা দেখায়, আধুনিক হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিকাশ বুঝতে সাভারকর, এম. এস. গোলওয়ালকর, RSS, VHP এবং BJP-র ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা জরুরি। তবে এই ইতিহাসকে একটিমাত্র ব্যক্তি বা ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না।
১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত Rashtriya Swayamsevak Sangh বা RSS হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন হিসেবে গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে BJP-র রাজনৈতিক বিকাশের সঙ্গে RSS-এর ঐতিহাসিক ও সাংগঠনিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এখানে একটি প্রয়োজনীয় সতর্কতা আছে: হিন্দু ধর্মবিশ্বাসী হওয়া, হিন্দু সংস্কৃতির প্রতি গর্ব অনুভব করা এবং রাষ্ট্রকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সংগঠিত করতে চাওয়া—এই তিনটি এক বিষয় নয়। একইভাবে, BJP-র প্রত্যেক সমর্থকও একই আদর্শ বা উদ্দেশ্য নিয়ে দলটিকে সমর্থন করেন, এমন সিদ্ধান্তেরও কোনও ভিত্তি নেই।
তথ্যসূত্র:
Manjari Katju, The History of Hindu Nationalism in India, Oxford University Press, 2019.
V. D. Savarkar, Essentials of Hindutva, 1923.
২. BJP-কে হিন্দুত্ববাদী বলার পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে?
CPI(M)-এর বক্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে বিচার করতে হলে BJP-র নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ডও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ক. BJP-র আদর্শগত উত্তরাধিকার
RSS এবং BJP-র ঐতিহাসিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত বিষয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষণেও BJP-কে হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রধান বাহক হিসেবে আলোচনা করা হয়। অক্সফোর্ডের গবেষণায় RSS-এর আদর্শ এবং BJP-র রাজনৈতিক প্রকল্পের সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
খ. ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে CPI(M)-এর বক্তব্য
CPI(M)-এর ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনী ইশতেহারে BJP-র রাজনীতিকে হিন্দুত্ববাদী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। দলটি অভিযোগ করেছে যে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতীক এবং সরকারি ক্ষমতার ব্যবহারের মাধ্যমে ধর্ম ও রাজনীতির সীমারেখা দুর্বল করা হচ্ছে।
এটি CPI(M)-এর নিজস্ব রাজনৈতিক মূল্যায়ন—এটিকে স্বাধীন গবেষণার সিদ্ধান্ত বলে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। কিন্তু দলটির অবস্থান যে নির্বাচনী প্রচারের পাশাপাশি তার ঘোষিত আদর্শেরও অংশ, সেই প্রমাণ ইশতেহারেই রয়েছে।
মূল সূত্র: CPI(M), Election Manifesto 2024
গ. অযোধ্যার রামমন্দির ও রাষ্ট্রীয় প্রতীক
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অযোধ্যায় রামমন্দিরের উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অংশগ্রহণ BJP-র রাজনৈতিক পরিচয় ও ধর্মীয় প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ককে আরও সামনে আনে। CPI(M) এটিকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে অসংগত বলে সমালোচনা করে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: কোনও রাজনৈতিক নেতা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিলেই একা সেই ঘটনা দিয়ে সম্পূর্ণ আদর্শ প্রমাণিত হয় না। কিন্তু যখন এই ধরনের ঘটনা দলীয় প্রচার, নির্বাচনী বার্তা, সংগঠনের ইতিহাস এবং রাষ্ট্রীয় প্রতীকের ব্যবহারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়, তখন বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করা যায়।
ঘ. নাগরিকত্ব ও ধর্মের সম্পর্ক
Citizenship Amendment Act বা CAA-তে নির্দিষ্ট প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা অমুসলিম ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে, নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে। সমালোচকদের বক্তব্য, নাগরিকত্বের নীতিতে ধর্মকে এইভাবে ব্যবহার করা সমান নাগরিকত্বের ধারণার সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে। BJP ও কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থকেরা এর পক্ষে নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার যুক্তি দিয়েছেন।
এই বিতর্কে CPI(M)-এর বিরোধিতার একটি স্পষ্ট নীতিগত ভিত্তি রয়েছে: রাষ্ট্র নাগরিকত্বের প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয়কে কতটা গুরুত্ব দেবে?
মূল কথা: BJP-কে হিন্দুত্ববাদী বলার পক্ষে ঐতিহাসিক ও আদর্শগত ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে সেই অভিযোগের জন্য পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন। ‘হিন্দুত্ববাদী’ শব্দটি ব্যবহার করলেই BJP-র প্রতিটি নীতি বা কাজ সম্পর্কে সব অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্য হয়ে যায় না।
৩. CPI(M)-এর নিজের ইতিহাস কি এই বিতর্ককে প্রভাবিত করে?
অবশ্যই। CPI(M)-এর হিন্দুত্ববিরোধিতা তার বৃহত্তর ধর্মনিরপেক্ষতা, শ্রেণির রাজনীতি এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতার সঙ্গে যুক্ত।
ভারতীয় বামপন্থী রাজনীতির ইতিহাসে সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা এবং শ্রমিক-কৃষকের ঐক্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শগত অবস্থান। বামপন্থী যুক্তি অনুযায়ী, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সমাজকে বিভক্ত করা হলে শ্রেণিগত বৈষম্য, মজুরি, কর্মসংস্থান, জমি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে যৌথ আন্দোলন দুর্বল হতে পারে।
কিন্তু CPI(M)-এর ইতিহাসকে কোনও ত্রুটিহীন বা একরৈখিক ইতিহাস হিসেবে দেখা যাবে না। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে কমিউনিস্টদের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষত ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান ছিল জটিল, কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি আক্রমণের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয় এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক অবস্থানও সেই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত হয়।
এই ইতিহাস দেখায়, বামপন্থী দলগুলিও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আদর্শগত অবস্থান এবং দেশীয় বাস্তবতার টানাপোড়েনের বাইরে ছিল না। সুতরাং CPI(M)-এর বর্তমান বক্তব্য বিচার করতে হলে তার ঘোষিত আদর্শের পাশাপাশি তার অতীত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও সমালোচনামূলকভাবে দেখতে হবে।
গবেষণার সূত্র:
K. Venugopal Reddy, “Working Class in ‘Quit India’ Movement: Madras Presidency, 1942,” Indian Historical Review.
৪. তাহলে BJP-কে হিন্দুত্ববাদী বলে CPI(M)-এর কী লাভ হতে পারে?
এখানেই প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক লাভের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা যায়, কিন্তু নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া বলা যায় না যে CPI(M) কেবল এই লাভের জন্যই হিন্দুত্বের বিরোধিতা করে।
প্রথম লাভ: নিজের আদর্শগত পরিচয়কে স্পষ্ট করা
CPI(M) নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, শ্রেণির রাজনীতি, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়ের পক্ষের দল হিসেবে তুলে ধরে। BJP-কে হিন্দুত্ববাদী হিসেবে চিহ্নিত করলে CPI(M) নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে তার বিপরীতে স্থাপন করতে পারে।
এটি রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি স্বাভাবিক কৌশল। প্রায় সব দলই নিজেদের পরিচয় স্পষ্ট করতে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সঙ্গে নীতিগত পার্থক্য তুলে ধরে।
দ্বিতীয় লাভ: সংখ্যালঘু ও ধর্মনিরপেক্ষ ভোটারদের কাছে পৌঁছনো
ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে বিশ্বাসী ভোটারদের কাছে হিন্দুত্বের বিরোধিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে। CPI(M) যদি এই ভোটারদের বোঝাতে পারে যে তাদের নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক সুরক্ষার প্রশ্নে দলটি সক্রিয়, তাহলে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
তবে সম্ভাব্য লাভ আর বাস্তব ভোটের লাভ এক নয়। ভোটাররা শুধু ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে ভোট দেন না। কর্মসংস্থান, স্থানীয় নেতৃত্ব, প্রশাসন, দুর্নীতি, কল্যাণমূলক প্রকল্প, প্রার্থী এবং জেতার সম্ভাবনাও তাঁদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
তৃতীয় লাভ: বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যে নিজের ভূমিকা বজায় রাখা
CPI(M)-এর ২০২৪ সালের নির্বাচনী অবস্থানে BJP-কে পরাজিত করা, বামপন্থীদের সংসদীয় শক্তি বাড়ানো এবং কেন্দ্রে একটি ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্প সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছিল।
এই অবস্থান দলটিকে বৃহত্তর বিরোধী রাজনীতিতে নিজের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে, BJP-বিরোধী ঐক্যে অংশ নিলেও CPI(M) নিজের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় বজায় রাখতে চায়।
সূত্র: CPI(M), Election Manifesto 2024
চতুর্থ লাভ: অর্থনৈতিক প্রশ্নকে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত করা
CPI(M) BJP-র সমালোচনায় ধর্মীয় মেরুকরণের পাশাপাশি কর্পোরেট স্বার্থ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং শ্রমিক-কৃষকের সমস্যাও তুলে ধরে। এর রাজনৈতিক যুক্তি হলো, অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্নে মানুষের অসন্তোষকে ধর্মীয় পরিচয়ের বিভাজন থেকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
এই কৌশল সফল হবে কি না, তা নির্ভর করে CPI(M) বাস্তবে কর্মসংস্থান, মজুরি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে কতটা বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প দিতে পারে তার ওপর। শুধু আদর্শগত সমালোচনা দিয়ে অর্থনৈতিক বিকল্পের প্রয়োজন মেটে না।
৫. পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী তথ্য কী বলে?
পশ্চিমবঙ্গে CPI(M)-এর রাজনৈতিক অবস্থান বোঝার জন্য নির্বাচনী ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একটি সতর্কতা প্রয়োজন: রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ভোটের হার দিয়ে কোনও দলের নির্দিষ্ট বক্তব্যের প্রভাব সরাসরি মাপা যায় না। তবে এই ফলাফল দলটির সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপট দেয়।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যের ভিত্তিতে ২০১১ ও ২০১৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল তুলনা করলে দেখা যায়:
নির্বাচনী বছর | বামফ্রন্টের ভোটের হার | তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটের হার |
|---|---|---|
২০১১ | প্রায় ৪১.১% | প্রায় ৩৮.৯% |
২০১৬ | প্রায় ২৬.০% | প্রায় ৪৪.৯% |
উৎস: পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পরিসংখ্যান; নির্বাচন কমিশন ও Chief Electoral Officer, West Bengal-এর প্রকাশিত তথ্য।
এই তুলনা থেকে বোঝা যায়, CPI(M)-এর হিন্দুত্ববিরোধী অবস্থান তার সামগ্রিক রাজনৈতিক পতন থামানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। তবে এর কারণ শুধু হিন্দুত্ববিরোধী প্রচারের সাফল্য বা ব্যর্থতা নয়। শাসনবিরোধী মনোভাব, সংগঠনের দুর্বলতা, তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান, স্থানীয় রাজনৈতিক সংঘাত, নেতৃত্ব এবং ভোটের কৌশল—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে।
২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে CPI(M) কোনও আসন জিততে পারেনি এবং তার ভোটের হার ছিল প্রায় ৪.৭৩ শতাংশ। BJP ৭৭টি আসন পায় এবং তার ভোটের হার ছিল প্রায় ৩৮.১৩ শতাংশ। এই তথ্য দেখায়, হিন্দুত্ববিরোধী অবস্থান একা CPI(M)-কে নির্বাচনী শক্তি ফিরিয়ে দিতে পারেনি।
সূত্র: ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল, নির্বাচন কমিশনের তথ্যের ভিত্তিতে সংকলিত।
এই তথ্য থেকে একটি সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়: CPI(M)-এর রাজনৈতিক বার্তা এবং ভোটারদের বাস্তব আচরণের মধ্যে ব্যবধান থাকতে পারে। তবে সেই ব্যবধানের কারণ নির্ধারণ করতে ভোটার-সমীক্ষা, আসনভিত্তিক ফলাফল এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
৬. CPI(M)-এর কৌশলের সীমাবদ্ধতা কোথায়?
হিন্দুত্বের বিরোধিতা CPI(M)-এর আদর্শগত পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু এই অবস্থান রাজনৈতিকভাবে কার্যকর করতে হলে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
প্রথমত, হিন্দুত্বের সমালোচনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান কী?
দ্বিতীয়ত, CPI(M) কীভাবে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এমন রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলবে, যা শুধু নির্বাচনের সময়ের জোটে সীমাবদ্ধ থাকবে না?
তৃতীয়ত, দলটি কি হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি মানুষের ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাকে সম্মান জানিয়ে রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের সমালোচনা করতে পারবে? এই পার্থক্য স্পষ্ট না হলে ধর্মবিশ্বাসী মানুষও বামপন্থী বক্তব্যকে নিজেদের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আক্রমণ বলে মনে করতে পারেন।
চতুর্থত, CPI(M) কি নিজের অতীত শাসন, সংগঠন ও রাজনৈতিক ভুলেরও একই রকম কঠোর মূল্যায়ন করতে প্রস্তুত? বিরোধী দলের আদর্শগত ত্রুটি তুলে ধরার বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে নিজের রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে কতটা স্বচ্ছ থাকা যায় তার ওপর।
এই প্রশ্নগুলি শুধু CPI(M)-এর জন্য নয়; BJP-সহ সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
৭. হিন্দুত্বের বিরোধিতা কি রাজনৈতিক সুবিধাবাদ?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য দুটি সম্ভাবনাকে আলাদা করতে হবে।
একদিকে, CPI(M)-এর ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতার একটি দীর্ঘ আদর্শগত ইতিহাস রয়েছে। ২০২৪ সালের ইশতেহারেও দলটি এই অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তাই হিন্দুত্ববিরোধিতাকে সম্পূর্ণ নতুন বা শুধুমাত্র নির্বাচনী সুবিধার জন্য তৈরি অবস্থান বলা তথ্যসম্মত হবে না।
অন্যদিকে, কোনও আদর্শগত অবস্থান রাজনৈতিক লাভের জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে। CPI(M) যখন BJP-র সঙ্গে নিজের পার্থক্য তুলে ধরে, তখন তা দলটির সমর্থক গোষ্ঠীকে একত্র করতে, বিরোধী রাজনীতিতে নিজের ভূমিকা বজায় রাখতে এবং ভোটারদের কাছে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করতে পারে।
কিন্তু এই সম্ভাব্য লাভ থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না যে দলটির সব বক্তব্যই অসৎ বা ভোটের হিসাবেই নির্ধারিত। একইভাবে, দলটি আদর্শের কথা বলছে বলেই তার প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে নিঃস্বার্থ বলে ধরে নেওয়াও ঠিক নয়।
রাজনীতির বাস্তবতা হলো, আদর্শ এবং স্বার্থ প্রায়ই পাশাপাশি কাজ করে। কোন ক্ষেত্রে কোনটি বেশি প্রভাব ফেলেছে, তা বুঝতে নির্দিষ্ট বক্তব্য, সিদ্ধান্ত, নির্বাচনী ফলাফল এবং সংগঠনের আচরণ পরীক্ষা করতে হয়।
শব্দের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রমাণ
BJP-কে হিন্দুত্ববাদী বলা CPI(M)-এর রাজনৈতিক ভাষার একটি কেন্দ্রীয় অংশ। এর পেছনে সাভারকর-প্রবর্তিত হিন্দুত্বের ইতিহাস, RSS-এর সঙ্গে BJP-র সম্পর্ক এবং ধর্ম, রাষ্ট্র ও নাগরিকত্ব নিয়ে সমসাময়িক বিতর্কের মতো ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে।
একই সঙ্গে CPI(M)-এর এই অবস্থান দলটির নিজস্ব আদর্শগত পরিচয়কে স্পষ্ট করে এবং সম্ভাব্যভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে সাহায্য করে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফল দেখায়, এই অবস্থান একা দলটির নির্বাচনী পুনরুত্থানের নিশ্চয়তা দেয়নি।
তাই মূল প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে CPI(M) কেন BJP-কে হিন্দুত্ববাদী বলে। আরও জরুরি প্রশ্ন হলো, CPI(M) কি তার ঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায় এবং অর্থনৈতিক বিকল্পকে বাস্তব রাজনৈতিক কাজে রূপ দিতে পারছে? একইভাবে, BJP-র সমালোচনা করতে গেলে তার নীতি ও কর্মকাণ্ডের নির্দিষ্ট প্রমাণ তুলে ধরা যেমন জরুরি, তেমনই CPI(M)-এর বক্তব্য ও অতীতকেও সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা উচিত নয়।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক লেবেল কোনও যুক্তির শেষ কথা নয়। সেটি বরং আরও গভীর অনুসন্ধানের শুরু।
নির্বাচিত তথ্যসূত্র
Manjari Katju, “The History of Hindu Nationalism in India,” The Oxford History of Hinduism: Modern Hinduism, Oxford University Press, 2019.
https://academic.oup.com/book/35280/chapter-abstract/299881760V. D. Savarkar, Essentials of Hindutva, 1923.
https://savarkar.org/en/encyc/2017/5/23/Essentials-of-Hindutva.htmlLars Tore Flåten, “The Inclusion-Moderation Thesis: India’s BJP,” Oxford Research Encyclopedia of Politics.
https://academic.oup.com/edited-volume/62239/chapter-abstract/550821306CPI(M), Election Manifesto 2024.
https://cpim.org/wp-content/uploads/old/documents/election_manifesto_english_april_2024.pdfElection Commission of India, Election Statistical Reports.
https://www.eci.gov.in/statistical-reportsK. Venugopal Reddy, “Working Class in ‘Quit India’ Movement: Madras Presidency, 1942,” Indian Historical Review.
https://journals.sagepub.com/doi/pdf/10.1177/037698361003700205
Official Editorial PDF Edition
Verified PublicationDownload a clean, high-resolution printable copy complete with tables, formulas, and high-res photography. Free for registered readers.
Community Feedback & Editorial Ratings
All Reader Reviews (0)
No reader reviews yet for this story.
Be the first to share your rating and perspective!














