চোরবাগানে ১৯ প্রাণের মৃত্যু: শোকের বাংলায় নিরাপত্তার প্রশ্ন, আর ‘ভাইপো-রাজনীতি’র ব্যঙ্গ
দুর্গাপুজোর আনন্দ কেন পরিণত হল শোকে? তদন্ত, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক দোষারোপের ভিড়ে মানুষের নিরাপত্তাই হোক প্রথম প্রশ্ন।

উনিশটি প্রাণ, দুর্গাপুজোর শোক—আর ‘ভাইপো-রাজনীতি’র মহাভারত!
কলকাতার চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু, আহত ২৫। উৎসবের আলো নিভে প্রশ্ন উঠেছে নিরাপত্তা, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে।
বঙ্গদেশে দুর্গাপুজো কেবল দেবী আরাধনা নহে—ইহা বাঙালির প্রাণের উৎসব, মিলনের মহামেলা। কিন্তু সেই আনন্দের আবহেই উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে ১৯টি প্রাণ ঝরে পড়িল! ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রবল বৃষ্টি, উপচে-পড়া ভিড় এবং ভিড় সামলানোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা গুরুতর প্রশ্নের মধ্যে ঘটে গেল এই মর্মান্তিক পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা। আহত হন অন্তত ২৫ জন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরু গলি, একটি নির্গমনপথ, ভিড় নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং বিভ্রান্তিকর ঘোষণার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত এখনও চলিতেছে; অতএব চূড়ান্ত দায় নির্ধারণের ভার তদন্তকারীদেরই।
কিন্তু হায় বঙ্গদেশ! প্যান্ডেলের থিমে আমরা লন্ডন, প্যারিস, স্বর্গ-মর্ত্য একাকার করিয়া ফেলি; অথচ মানুষের নিরাপদে প্রবেশ ও বাহির হওয়ার পথটি ঠিক করিতে গিয়া যেন আমাদের সভ্যতার রথের চাকা কাদায় বসিয়া যায়! দেবীর মূর্তির উচ্চতা মাপিবার লোকের অভাব নাই, আলোর বাহারের তুলনা করিবার লোকেরও অভাব নাই—কিন্তু বিপদের সময় কতখানি নিরাপদ পথ, কতজন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, কত দ্রুত অ্যাম্বুল্যান্স পৌঁছাইবে, এই সামান্য প্রশ্নগুলির উত্তর কোথায়?
আর এদিকে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে পর্দা উঠিলেই শুরু হয় দোষারোপের মহোৎসব। এক পক্ষ বলে, ‘ওদের ব্যর্থতা’; অন্য পক্ষ বলে, ‘এদের ষড়যন্ত্র’। কোথাও ‘ভাইপো-রাজনীতি’, কোথাও ক্ষমতার হিসাব, কোথাও মাইক্রোফোন হাতে বীরত্বের প্রদর্শনী। যেন মৃত মানুষেরাও রাজনৈতিক দলীয় কার্যালয়ের সদস্যপদ লইয়া তবে শোক পাইবেন! আহা, কী বিচিত্র বিচার! যে পরিবারের ঘরের মানুষ আর ফিরিবে না, তাহাদের কাছে ‘ভাইপো’ কোন দলের, ‘কাকা’ কোন দলের—এই প্রশ্নের মূল্য কতটুকু?
বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যঙ্গাত্মক গদ্যের স্মৃতি মনে পড়ে—আমাদের সমাজে বাক্যবীরের অভাব নাই, কিন্তু কাজে দায়িত্ববান মানুষের সন্ধান করিতে গেলে প্রদীপ হাতে বাহির হইতে হয়। অবশ্য ব্যঙ্গেরও সীমা আছে; এই শোকের মুহূর্তে মৃতদের দুঃখকে হাসির বিষয় করা নহে, বরং ক্ষমতার আত্মতুষ্টিকে প্রশ্ন করা কর্তব্য। রাজনীতি যদি মানুষের জন্য হয়, তবে মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নে দলীয় রং এত ঘন হইবে কেন?
রাজ্য সরকার তদন্তের কথা বলিয়াছে, সাতজনকে গ্রেফতারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু গ্রেফতারই শেষ কথা নহে। কীভাবে ভিড় নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল? প্রবেশ ও নির্গমনের পথ যথেষ্ট ছিল কি? বৃষ্টির পূর্বাভাস ও জনসমাগম বিবেচনায় বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি? ঘোষণাগুলি কে দিয়েছিলেন, এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশ, পুজো কমিটি ও নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় কেমন ছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর চাই—অনুমান নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে।
আমাদের দাবি স্পষ্ট: নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত, দায় প্রমাণিত হলে আইনানুগ শাস্তি, আহতদের যথাযথ চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে থাকা এবং ভবিষ্যতের পুজোয় কার্যকর ভিড়-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। প্রতিটি বড় মণ্ডপে পর্যাপ্ত নির্গমনপথ, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, জরুরি চিকিৎসা, স্পষ্ট ঘোষণা এবং পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় নিশ্চিত করিতে হইবে।
দুর্গা প্রতিমার সামনে দাঁড়াইয়া আমরা অসুরবধের কাহিনি স্মরণ করি। কিন্তু বাস্তবের অসুর কেবল পুরাণে বাস করে না—অবহেলা, আত্মতুষ্টি, দায় এড়ানো এবং মানুষের প্রাণের চেয়ে প্রচারকে বড় করাও সমাজের শত্রু। এই উনিশটি মৃত্যু যেন আর একটি সংবাদ-শিরোনাম হইয়া বিস্মৃতির ধুলোয় চাপা না পড়ে।
শোকের দিনে দলীয় ঢাক বাজাইয়া লাভ নাই। আগে মানুষের প্রাণের হিসাব দিন, তারপর রাজনীতির হিসাব কষিবেন। কারণ ভোটের বাক্স আবার ভরিবে—কিন্তু যে উনিশটি জীবন নিভিয়া গেল, তাহারা আর কোনওদিন ফিরিবে না।
Official Editorial PDF Edition
Verified PublicationDownload a clean, high-resolution printable copy complete with tables, formulas, and high-res photography. Free for registered readers.
Community Feedback & Editorial Ratings
All Reader Reviews (0)
No reader reviews yet for this story.
Be the first to share your rating and perspective!














