ভারতের সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী: প্রেক্ষাপট, কারণ ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা
প্রথম থেকে সাম্প্রতিকতম: ইউপিএসসি ও ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষার জন্য সংশোধনী আইনের সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ

ভারতীয় সংবিধান কোনো অনড় বা অপরিবর্তনীয় দলিল নয়; বরং এটি একটি গতিশীল এবং জীবন্ত প্রতিষ্ঠান (Living Document)। দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তর, বিচারবিভাগীয় ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রয়োজনে সংবিধানের ৩৬৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ এতে নানা পরিবর্তন ও সংযোজন এনেছে। ইউপিএসসি (UPSC), ডব্লিউবিসিএস (WBCS), এসএসসি (SSC) সহ বিভিন্ন সর্বভারতীয় ও রাজ্যভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ক্ষেত্রে এই সংশোধনীগুলির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, তৎকালীন শাসনভার এবং রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে কালানুক্রমিকভাবে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান সংশোধনীগুলির বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হলো।
১. প্রথম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৫১
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
স্বাধীনতার ঠিক পরেই জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ, ভূমি সংস্কার এবং বাক-স্বাধীনতার পরিধি নির্ধারণ নিয়ে বিচার বিভাগের সঙ্গে সরকারের সংঘাত দেখা দেয়। রমেশ থাপার বনাম মাদ্রাজ রাজ্য এবং কামেশ্বর সিং বনাম বিহার রাজ্য মামলায় আদালতের রায়ের প্রেক্ষিতে এই সংশোধনী অনিবার্য হয়ে ওঠে।
মূল বৈশিষ্ট্য
- নবম তফসিল (Ninth Schedule) যুক্ত করা হয়, যাতে বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার হাত থেকে ভূমি সংস্কার আইনগুলিকে সুরক্ষিত রাখা যায়।
- অনুচ্ছেদ ১৯(২)-এর অধীনে বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর ‘যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ’ আরোপ করা হয়।
- সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে অনগ্রসর শ্রেণীর অগ্রগতির জন্য অনুচ্ছেদ ১৫(৪) সংযোজন করা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: জওহরলাল নেহেরু (কার্যকাল: ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ – ২৭ মে ১৯৬৪)
২. সপ্তম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৫৬
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
ভাষাগত ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনের দাবিতে দেশজুড়ে তীব্র গণআন্দোলন শুরু হয়। বিশেষ করে অন্ধ্রপ্রদেশের দাবিতে পোট্টি শ্রীরামুলুর আত্মবলিদানের পর ফজল আলির নেতৃত্বে ‘রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন’ গঠিত হয়। সেই কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নেই এই আইন আনা হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- পূর্বতন ‘Part A, B, C, D’ ভিত্তিক রাজ্যের বিভাজন সম্পূর্ণ বিলোপ করা হয়।
- ১৪টি রাজ্য এবং ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠন করা হয়।
- দুই বা ততোধিক রাজ্যের জন্য একটি যৌথ হাইকোর্ট গঠনের ক্ষমতা সংসদকে দেওয়া হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: জওহরলাল নেহেরু (কার্যকাল: ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ – ২৭ মে ১৯৬৪)
৩. চব্বিশতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৭১
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
১৯৬৭ সালের বিখ্যাত ‘গোলকনাথ মামলায়’ সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে সংসদ মৌলিক অধিকার খর্ব বা প্রত্যাহার করতে পারে না। বিচারবিভাগের এই বিধিনিষেধ অতিক্রম করতেই চব্বিশতম সংশোধনী আনা হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- সংসদকে মৌলিক অধিকার সহ সংবিধানের যে কোনো অংশ সংশোধন করার পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করা হয়।
- সংবিধান সংশোধনী বিলে রাষ্ট্রপতির সম্মতি প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: ইন্দিরা গান্ধী (কার্যকাল: ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৬ – ২৪ মার্চ ১৯৭৭)
৪. পঁচিশতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৭১
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ মামলা (আর. সি. কুপার বনাম ভারত ইউনিয়ন) এবং রাজন্যভাতা রদ সংক্রান্ত মামলায় আদালতের প্রতিকূল রায়ের প্রেক্ষিতে সম্পত্তির অধিকার সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- মৌলিক অধিকার হিসেবে সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা হ্রাস করা হয়।
- অনুচ্ছেদ ৩১সি (31C) যুক্ত করা হয়, যেখানে বলা হয় অনুচ্ছেদ ৩৯(বি) ও (সি)-এর নির্দেশমূলক নীতি রূপায়ণে গৃহীত আইন অনুচ্ছেদ ১৪, ১৯ ও ৩১ লঙ্ঘনের অজুহাতে বাতিল করা যাবে না।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: ইন্দিরা গান্ধী (কার্যকাল: ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৬ – ২৪ মার্চ ১৯৭৭)
৫. ছাব্বিশতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৭১
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
স্বাধীনতার সময় দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতে অন্তর্ভুক্তির শর্ত হিসেবে প্রাক্তন রাজপরিবারগুলিকে নির্দিষ্ট সরকারি ভাতা বা ‘প্রিভি পার্স’ (Privy Purse) ও বিশেষ সামাজিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হতো। সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তা বাতিলের দাবি ওঠে।
মূল বৈশিষ্ট্য
- প্রাক্তন রাজন্যবর্গের সমস্ত বিশেষ মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা এবং প্রিভি পার্স বিলুপ্ত করা হয় (অনুচ্ছেদ ২৯১ ও ৩৬২ বাতিল)।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: ইন্দিরা গান্ধী (কার্যকাল: ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৬ – ২৪ মার্চ ১৯৭৭)
৬. ছত্রিশতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৭৫
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
সিকিমে চোগিয়াল রাজতন্ত্রের অবসানের পর সেখানকার জনগণ ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পক্ষে বিপুল গণভোট দেয়। সেই রাজনৈতিক ইচ্ছাকে সাংবিধানিক রূপ দিতে এই সংশোধনী গৃহীত হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- সিকিমকে ভারতের ২২তম পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হয় এবং দশম তফসিল থেকে সিকিমের সহযোগী রাজ্যের তকমা প্রত্যাহার করা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: ইন্দিরা গান্ধী (কার্যকাল: ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৬ – ২৪ মার্চ ১৯৭৭)
৭. বিয়াল্লিশতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৭৬ (ক্ষুদ্র সংবিধান বা Mini Constitution)
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
জাতীয় জরুরি অবস্থার (১৯৭৫–৭৭) আবহে স্বরণ সিং কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই সুদূরপ্রসারী সংশোধনী আনা হয়, যার মাধ্যমে ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক ও শাসনব্যবস্থার ভারসাম্যে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- প্রস্তাবনায় ‘সমাজতান্ত্রিক’ (Socialist), ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ (Secular) এবং ‘সংহতি’ (Integrity) শব্দ তিনটি যুক্ত হয়।
- অনুচ্ছেদ ৫১এ-এর অধীনে নাগরিকদের জন্য ১০টি মৌলিক কর্তব্য (Fundamental Duties) অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
- শিক্ষা, বন, ওজন ও পরিমাপ, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং বিচার প্রশাসনকে রাজ্য তালিকা থেকে যৌথ তালিকায় স্থানান্তরিত করা হয়।
- লোকসভা ও বিধানসভার মেয়াদ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬ বছর করা হয় (যা পরবর্তীতে প্রত্যাহার করা হয়)।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: ইন্দিরা গান্ধী (কার্যকাল: ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৬ – ২৪ মার্চ ১৯৭৭)
৮. চুয়াল্লিশতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৭৮
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
জরুরি অবস্থার অপব্যবহার রোধ করতে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে জরুরি-উত্তর মোরারজি দেশাইয়ের জনতা পার্টি সরকার এই সংশোধনী পাস করায়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- সম্পত্তির অধিকারকে মৌলিক অধিকারের তালিকা (অনুচ্ছেদ ৩১) থেকে বাদ দিয়ে অনুচ্ছেদ ৩০০এ-এর অধীনে কেবল একটি আইনি অধিকারে পরিণত করা হয়।
- জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে ‘অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা’ শব্দটির বদলে ‘সশস্ত্র বিদ্রোহ’ যুক্ত করা হয়।
- জরুরি অবস্থার সময়ও অনুচ্ছেদ ২০ ও ২১ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) কোনোভাবেই স্থগিত করা যাবে না বলে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়।
- লোকসভা ও বিধানসভার মেয়াদ পুনরায় ৫ বছরে নামিয়ে আনা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: মোরারজি দেশাই (কার্যকাল: ২৪ মার্চ ১৯৭৭ – ২৮ জুলাই ১৯৭৯)
৯. বায়ান্নতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৮৫ (দলত্যাগ বিরোধী আইন)
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
১৯৭০ ও ৮০-র দশকে ভারতে ‘আয়া রাম, গয়া রাম’ সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে দলবদলের রাজনীতির কারণে ঘনঘন সরকার পতন ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। সেই দুর্নীতি রুখতে এই কঠোর আইনি পরিকাঠামো তৈরি করা হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- সংবিধানে ‘দশম তফসিল’ (Tenth Schedule) যুক্ত করে সংসদ ও বিধানসভার সদস্যদের দলত্যাগ সংক্রান্ত অযোগ্যতার নিয়মাবলী প্রবর্তন করা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: রাজীব গান্ধী (কার্যকাল: ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪ – ২ ডিসেম্বর ১৯৮৯)
১০. একষট্টিতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৮৮ (কার্যকর ১৯৮৯)
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
ভারতের তরুণ সমাজকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আরও বেশি করে সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্যে ভোটাধিকারের বয়সসীমা কমানোর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- অনুচ্ছেদ ৩২৬ সংশোধন করে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে ভোটদানের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৮ বছর করা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: রাজীব গান্ধী (কার্যকাল: ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪ – ২ ডিসেম্বর ১৯৮৯)
১১. উনসত্তরতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৯১
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
ভারতের রাজধানী অঞ্চল দিল্লির প্রশাসনিক স্বকীয়তা বজায় রেখে স্থানীয় বাসিন্দাদের গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য বালাকৃষ্ণান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই সংস্কার হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল দিল্লিকে ‘জাতীয় রাজধানী অঞ্চল দিল্লি’ (National Capital Territory of Delhi) হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়।
- অনুচ্ছেদ ২৩৯এএ সংযোজন করে দিল্লির জন্য একটি ৭০ সদস্যের বিধানসভা এবং ৭ সদস্যের মন্ত্রিসভার সংস্থান রাখা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: পি. ভি. নরসিমা রাও (কার্যকাল: ২১ জুন ১৯৯১ – ১৬ মে ১৯৯৬)
১২. তিহাত্তরতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৯২
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
তৃণমূল স্তরে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বলবন্ত রাই মেহতা ও এল. এম. সিংভি কমিটির সুপারিশকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা পঞ্চায়েতি রাজ আইন পাস করা হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- সংবিধানে নতুন অংশ ‘Part IX’ এবং ‘একাদশ তফসিল’ (Eleventh Schedule) যুক্ত হয়, যাতে পঞ্চায়েতের জন্য ২৯টি কার্যকরী বিষয় নির্ধারিত হয়।
- গ্রাম, ব্লক ও জেলা স্তরে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচন এবং মহিলাদের জন্য ন্যূনতম এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: পি. ভি. নরসিমা রাও (কার্যকাল: ২১ জুন ১৯৯১ – ১৬ মে ১৯৯৬)
১৩. চুয়াত্তরতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৯২
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
নগরাঞ্চলের দ্রুত বিকাশ ও নগর প্রশাসনের সংস্কার নিশ্চিত করতে গ্রাম পঞ্চায়েতের ন্যায় পুরসভাগুলিকেও সাংবিধানিক ভিত্তি প্রদান করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল।
মূল বৈশিষ্ট্য
- সংবিধানে ‘Part IX-A’ এবং ‘দ্বাদশ তফসিল’ (Twelfth Schedule) সংযোজিত হয়, যাতে নগর প্রশাসনের ১৮টি কার্যতালিকা অন্তর্ভুক্ত থাকে।
- নগর পঞ্চায়েত, পুরপরিষদ এবং পৌর নিগম গঠনের নিয়মাবলী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: পি. ভি. নরসিমা রাও (কার্যকাল: ২১ জুন ১৯৯১ – ১৬ মে ১৯৯৬)
১৪. ছিয়াশিতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ২০০২
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
১৯৯৩ সালের উন্নিকৃষ্ণান মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর শিক্ষাকে প্রতিটি শিশুর অপরিহার্য মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সার্বিক দাবি ওঠে।
মূল বৈশিষ্ট্য
- অনুচ্ছেদ ২১এ যুক্ত করে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার করা হয়।
- অনুচ্ছেদ ৫১এ-তে ১১তম মৌলিক কর্তব্য হিসেবে অভিভাবকদের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়।
- অনুচ্ছেদ ৪৫ সংশোধন করে শৈশবকালীন যত্ন ও শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: অটল বিহারী বাজপেয়ী (কার্যকাল: ১৯ মার্চ ১৯৯৮ – ২২ মে ২০০৪)
১৫. একানব্বইতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ২০০৩
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
রাজনৈতিক দলগুলির অহেতুক রাজনৈতিক দরকষাকষি ও সুবিশাল জাম্বো মন্ত্রিসভা গঠন বন্ধ করে প্রশাসনিক খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ গৃহীত হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় ক্ষেত্রে মোট মন্ত্রীর সংখ্যা (প্রধানমন্ত্রী/মুখ্যমন্ত্রী সহ) লোকসভা বা বিধানসভার মোট সদস্য সংখ্যার ১৫%-এর বেশি হতে পারবে না (ছোট রাজ্যের ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী সহ ন্যূনতম ১২ জন)।
- দশম তফসিলে ১/৩ অংশ দলত্যাগের ক্ষেত্রে যে সুরক্ষাকবচ ছিল তা বাতিল করে দলত্যাগ বিরোধী আইনকে আরও কঠোর করা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: অটল বিহারী বাজপেয়ী (কার্যকাল: ১৯ মার্চ ১৯৯৮ – ২২ মে ২০০৪)
১৬. বিরানব্বইতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ২০০৩
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে এবং আঞ্চলিক ক্ষোভ প্রশমনের উদ্দেশ্যে অষ্টম তফসিলে নতুন ভাষা অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- সংবিধানের অষ্টম তফসিলে বোড়ো (Bodo), ডোগরি (Dogri), মৈথিলি (Maithili) এবং সাঁওতালি (Santhali)—এই চারটি ভাষা যুক্ত করা হয়, যার ফলে তপশিলি ভাষার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২টিতে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: অটল বিহারী বাজপেয়ী (কার্যকাল: ১৯ মার্চ ১৯৯৮ – ২২ মে ২০০৪)
১৭. নিরানব্বইতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ২০১৪ (পরবর্তীতে বাতিল)
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
বিচারক নিয়োগের কলেজিয়াম পদ্ধতির অস্বচ্ছতা ও স্বজনপোষণের অভিযোগ দূর করতে বিচার বিভাগীয় নিয়োগে সরকারের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এই বিল আনা হয়েছিল।
মূল বৈশিষ্ট্য
- জাতীয় বিচারবিভাগীয় নিয়োগ কমিশন (NJAC) গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ এই সংশোধনীকে বিচারবিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থী ও মৌলিক কাঠামোর লঙ্ঘন হিসেবে ঘোষণা করে সম্পূর্ণ বাতিল করে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: নরেন্দ্র মোদী (কার্যকাল: ২৬ মে ২০১৪ – বর্তমান)
১৮. একশততম সংবিধান সংশোধনী আইন, ২০১৫
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ চার দশকের ছিটমহল সমস্যা সমাধান ও স্থলসীমান্ত চুক্তি (Land Boundary Agreement - LBA) ১৯৭৪ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল ভারতকে হস্তান্তর করা হয় এবং বিনিময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল বাংলাদেশকে প্রদান করা হয়। প্রথম তফসিলে পশ্চিমবঙ্গ, অসম, মেঘালয় ও ত্রিপুরার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: নরেন্দ্র মোদী (কার্যকাল: ২৬ মে ২০১৪ – বর্তমান)
১৯. একশত একতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ২০১৬ (জিএসটি)
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
ভারতে জটিল ও একাধিক পরোক্ষ কর ব্যবস্থার কারণে পণ্যের উপর করের বোঝা এবং ব্যবসায়িক জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। ‘এক দেশ, এক কর’ ব্যবস্থা প্রণয়নের লক্ষ্যে এই বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যকর হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- পণ্য ও পরিষেবা কর (GST) চালু হয়।
- কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির সমন্বয়ের জন্য অনুচ্ছেদ ২৭৯এ-এর অধীনে ‘জিএসটি কাউন্সিল’ গঠনের ব্যবস্থা করা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: নরেন্দ্র মোদী (কার্যকাল: ২৬ মে ২০১৪ – বর্তমান)
২০. একশত তিনতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ২০১৯ (ইডব্লিউএস সংরক্ষণ)
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
সাধারণ শ্রেণীর অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর ব্যক্তিদের উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকুরিতে সমসুযোগ নিশ্চিত করতে এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- অনুচ্ছেদ ১৫(৬) এবং ১৬(৬) সংযোজন করে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণীর (EWS) জন্য সর্বোচ্চ ১০% সংরক্ষণের সাংবিধানিক সংস্থান করা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: নরেন্দ্র মোদী (কার্যকাল: ২৬ মে ২০১৪ – বর্তমান)
২১. একশত চারতম সংবিধান সংশোধনী আইন, ২০১৯
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
তপশিলি জাতি ও উপজাতিদের প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখা এবং সাম্প্রতিক সামাজিক প্রয়োজনীয়তার আলোকে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কোটা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন ছিল।
মূল বৈশিষ্ট্য
- লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাগুলিতে এসসি (SC) ও এসটি (ST) সম্প্রদায়ের আসন সংরক্ষণের মেয়াদ আরও ১০ বছরের জন্য (২০৩০ পর্যন্ত) বাড়ানো হয়।
- লোকসভা ও বিধানসভায় অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের জন্য সংরক্ষিত মনোনীত আসন ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: নরেন্দ্র মোদী (কার্যকাল: ২৬ মে ২০১৪ – বর্তমান)
২২. একশত ছয়তম সংবিধান সংশোধনী আইন, ২০২৩ (নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম)
পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
সংসদীয় গণতন্ত্রে নারীদের দীর্ঘদিনের ন্যায্য রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রায় তিন দশক ধরে ঝুলে থাকা মহিলা সংরক্ষণ বিল পাস করানো হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
- লোকসভা, রাজ্য বিধানসভা এবং দিল্লি বিধানসভায় মহিলাদের জন্য মোট আসনের এক-তৃতীয়াংশ (৩৩%) সংরক্ষণের ঐতিহাসিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি পরবর্তী জনগণনা এবং আসন পুনর্বিন্যাসের (Delimitation) পর কার্যকর হবে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী: নরেন্দ্র মোদী (কার্যকাল: ২৬ মে ২০১৪ – বর্তমান)
পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও উপসংহার
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে সংবিধান সংশোধনীর এই কালপঞ্জি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ১৯৫০-এর দশকে ভূমি সংস্কার, ১৯৭০-এর দশকে বিচার বিভাগ ও সংসদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ১৯৮০-র দশকে রাজনৈতিক শুদ্ধাচার ও যুব ক্ষমতায়ন, ১৯৯০-এর দশকে স্থানীয় স্বশাসন এবং একবিংশ শতাব্দীতে আর্থ-সামাজিক সমতা ও সমকালীন প্রযুক্তিগত-অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকে সাংবিধানিক গতিপথ আবর্তিত হয়েছে। প্রতিটি সংশোধনীর নেপথ্যে কার্যকর কারণ এবং তার সামাজিক প্রভাব পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে রাখা পরীক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনে বিশেষ সহায়ক হবে।
Official Editorial PDF Edition
Verified PublicationDownload a clean, high-resolution printable copy complete with tables, formulas, and high-res photography. Free for registered readers.
Community Feedback & Editorial Ratings
All Reader Reviews (0)
No reader reviews yet for this story.
Be the first to share your rating and perspective!














