বাঙালির বিজয়া দশমী বনাম উত্তর ভারতের দশেরা: সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন না হিন্দি বলয়ের আগ্রাসন?
উৎসবের আত্মপরিচয় ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: একই তিথি কিন্তু পৃথক জীবনাদর্শ
শরতের শুক্লা দশমী তিথিতে গোটা ভারতজুড়েই উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। তবে ভৌগোলিক সীমারেখা এবং লোকাচারের ভিন্নতায় এই উৎসবের প্রকাশভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। বাঙালির কাছে এই দিনটি দেবী দুর্গার মর্ত্যলোক ছেড়ে কৈলাসে ফেরার করুণ ও আনন্দঘন দিন ‘বিজয়া দশমী’। অন্যদিকে, উত্তর ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে এই তিথি উদযাপিত হয় ‘দশেরা’ বা ‘বিজয়াদশমী’ হিসেবে, যা মূলত দশানন রাবণের বিরুদ্ধে রামচন্দ্রের বিজয়ের স্মারক।
বাঙালির দুর্গোৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কন্যাস্বরূপা উমা। পুরাণের মহিষাসুরমর্দিনী রূপের পাশাপাশি বঙ্গীয় লোকায়ত ধারায় দুর্গা এক মমতাময়ী গৃহবধূ, যিনি বছরে একবার সপরিবারে পিতৃগৃহে আসেন। দশমীর সিঁদুরখেলা, মিষ্টিমুখ, গুরুজনদের প্রণাম এবং কোলাকুলি মূলত এক পারিবারিক ও সামাজিক পুনর্মিলনের রূপ। বিপরীতে, উত্তর ভারতের দশেরা মূলত অশুভ শক্তির ওপর শুভ শক্তির চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতীক। সেখানে নয় দিন ধরে চলা রামলীলার সমাপ্তিতে দশমীর সন্ধ্যায় প্রকাণ্ড রাবণ, মেঘনাদ এবং কুম্ভকর্ণের কুশপুতুল দাহ করার প্রচলন রয়েছে।
দশমী ও দশেরার মৌল পার্থক্য
ধর্মতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে উভয় উৎসবের ভাবাদর্শে স্পষ্ট কিছু তফাত ধরা পড়ে:
উপাসনার চরিত্র: বাঙালি সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু নারীশক্তি বা মাতৃসাধনা। অন্যদিকে উত্তর ভারতের দশেরা মূলধারায় পুরুষোত্তম রামের বীরত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আখ্যান।
অনুষ্ঠানের আবহ: বাঙালির দশমী বিসর্জনের সুরে বিষাদময়, যার পরপরই ঘটে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বিনিময়। দশেরার আবহ যুদ্ধজয়ের উল্লাস ও আতশবাজির মহোৎসবে মুখর।
পৌরাণিক ভিন্নতা: কৃত্তিবাসী রামায়ণে উল্লিখিত রামের ‘অকালবোধন’-এর কারণে বঙ্গীয় ধারায় দুর্গোৎসব ও রামের অনুষঙ্গ মিলেমিশে গেলেও পূজার মূল মন্ত্র ও আচার বিশুদ্ধ শাক্ত ধারায় পরিচালিত।
বাঙালির পুজো কি দশেরার পথে? বামপন্থী নেতৃত্বের উদ্বেগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজা উদযাপনের ধরনের দৃশ্যমান পরিবর্তনের দিকে আঙুল তুলছেন বহু সমাজবিজ্ঞানী এবং বামপন্থী রাজনীতিবিদরা। সিপিআই(এম) এবং অন্যান্য বামপন্থী নেতৃত্বদের মতে, বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতিতে উত্তর ভারতীয় উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে।
"বাঙালির দুর্গাপূজা ছিল সর্বজনীন ও ধর্মনিরপেক্ষতার মিলনক্ষেত্র। কিন্তু আজ পরিকল্পিতভাবে এই শাক্ত ঐতিহ্যকে হিন্দি বলয়ের আক্রমণাত্মক ভাবাবেগে রূপান্তর করার চেষ্টা চলছে। সিঁদুরখেলা কিংবা কোলাকুলির মিষ্টি অনুভূতির জায়গায় উগ্র অস্ত্রের আস্ফালন এবং হিন্দি স্লোগান ঢুকিয়ে বাংলার নিজস্ব বহুত্ববাদী রূপকে মুছে ফেলার চক্রান্ত দৃশ্যমান।" — এক প্রবীণ বামপন্থী নেতার সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ।
সিপিআই(এম) নেতৃত্বের একাংশের অভিযোগ, গত কয়েক দশকে অস্ত্রমিছিল, লাউডস্পিকারে তীব্র হিন্দি ভজনের আধিক্য এবং রাবণ পোড়ানোর অনুকরণ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে লোকায়ত বাঙালি দুর্গাপূজা নিজস্ব সারল্য হারাচ্ছে। তাদের মতে, এটি নিছক ধর্মীয় আচার নয়, বরং রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের সমজাতীয়করণ চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন নাকি স্বাভাবিক সংমিশ্রণ?
যদিও সমাজতাত্ত্বিকদের একাংশ বিষয়টিকে সম্পূর্ণ অন্য চোখে দেখেন। তাঁদের মতে, বিশ্বায়ন, অভ্যন্তরীণ পরিযাণ এবং হিন্দি পপ-কালচারের প্রভাবে মহানগরী কলকাতা-সহ বিভিন্ন মফস্বল এলাকায় উৎসবের বাহ্যিক রূপে পরিবর্তন আসা অস্বাভাবিক নয়। অবাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষের বাংলায় বহু প্রজন্মের বসবাস রয়েছে, যার ফলে ঐতিহাসিকভাবেও সংমিশ্রণ ঘটেছে।
তবে আশঙ্কার জায়গাটি হলো বৈচিত্র্যের অপমৃত্যু। বাঙালি মননে উমা বা দুর্গা কখনই ভয় বা আধিপত্যের প্রতীক নন, তিনি ঘরের মেয়ে। সেই মেয়েকে বিদায় জানানোর ভেতর যে সুকুমার মায়ার টান রয়েছে, তা যখন আগ্রাসী শক্তির উদযাপনে বদলে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ঐতিহ্যের শিকড়ে ফেরার দায়
সংস্কৃতি সতত প্রবাহমান, কিন্তু আত্মপরিচয়ের অবলুপ্তির বিনিময়ে এই রূপান্তর কাম্য হতে পারে না। রাজনৈতিক তরজা যাই থাকুক না কেন, বিজয়া দশমীর প্রকৃত শিক্ষা প্রতিহিংসা বা বিজয়োল্লাস নয়, বরং 'শুভ বিজয়া'র মাধ্যমে শত্রুতা ভুলে প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলা। বাঙালি যদি তার লোকায়ত মানবতাবাদী ঐতিহ্য বজায় রাখতে পারে, তবেই বিজয়া দশমী তার আপন গৌরবে মহিমান্বিত থাকবে।
Official Editorial PDF Edition
Verified PublicationDownload a clean, high-resolution printable copy complete with tables, formulas, and high-res photography. Free for registered readers.
Community Feedback & Editorial Ratings
All Reader Reviews (0)
No reader reviews yet for this story.
Be the first to share your rating and perspective!














