বিভ্রান্তির মেঘ চিরে তথ্যের সত্যদর্শন: হ্যান্স রস্লিংয়ের ‘ফ্যাক্টফুলনেস’ পর্যালোচনা
Mallika Jana Hatai


Factfulness
Author: Hans Rosling, Ola Rosling & Anna Rosling Rönnlund
Publisher: Sceptre (UK edition) (2018)
Inclusive of all taxes
দৃষ্টিভঙ্গির বিভ্রান্তি ও মূল থিসিস
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজ খুললে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দায় চোখ রাখলেই মনে হয় পৃথিবী ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ক্ষুধা, যুদ্ধ, মহামারি আর চরম দারিদ্র্য যেন গ্রাস করছে মানবজাতিকে। কিন্তু এই সার্বিক নৈরাশ্য কি আদৌ বাস্তবসম্মত? সুইডিশ চিকিৎসক, আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পরিসংখ্যানবিদ হ্যান্স রস্লিং তাঁর পুত্র ও্লা রস্লিং এবং পুত্রবধূ আন্না রস্লিং রনলুন্ডকে সাথে নিয়ে রচিত ‘ফ্যাক্টফুলনেস’ গ্রন্থে এই মৌলিক প্রশ্নটিকেই অত্যন্ত নির্মোহভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। গ্রন্থটির কেন্দ্রীয় বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট: আমাদের সামগ্রিক বিশ্ববীক্ষা মূলত বাস্তবতার ওপর নয়, বরং বিবর্তনীয় আদিম সংস্কার ও একধরনের সংবেদনশীল নাটুকেপনার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
রস্লিং দেখিয়েছেন কীভাবে বিশ্বকে ‘উন্নত’ এবং ‘অনুন্নত’—এই সরল বাইনারিতে ভাগ করার অভ্যাস আমাদের চিন্তাচেতনাকে পঙ্গু করে রাখে। এর বিপরীতে তিনি মানবসমাজকে চারটি সুনির্দিষ্ট আয়ের স্তরে (Four Income Levels) ভাগ করে দেখান যে, বিশ্বের সিংহভাগ মানুষ এখন চরম দারিদ্র্য (লেভেল ১) অতিক্রম করে মধ্যবর্তী স্তরগুলোতে অবস্থান করছে। এই কাঠামোগত রূপান্তরটি মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর ও ইতিবাচক অর্জনগুলোর একটি, যা তথাকথিত প্রথাসিদ্ধ বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্বদের দৃষ্টিও প্রায়শই এড়িয়ে যায়।
উপস্থাপনার শৈলী ও প্রাঞ্জল বয়ান
গবেষণাধর্মী গ্রন্থ হলেও ‘ফ্যাক্টফুলনেস’-এর গদ্য কোনোভাবেই কাঠখোট্টা একাডেমিক ভারাক্রান্ত নয়। রস্লিংয়ের রচনার মূল শক্তি হলো তাঁর আত্মজৈবনিক রসবোধ এবং জনস্বাস্থ্যের মাঠে কাজ করার রক্তমাংসের অভিজ্ঞতা। মোজাম্বিকে তরুণ চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার সময় সংকটময় মুহূর্তে নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের স্মৃতিচারণ থেকে শুরু করে কিউবার স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তব পর্যবেক্ষণ—প্রতিটি উদাহরণই তাত্ত্বিক ধারণাকে মানবিক উষ্ণতায় রূপান্তর করে।
“পরিস্থিতি একই সঙ্গে খারাপ হতে পারে, আবার ক্রমশ উন্নতির দিকেও এগোতে পারে। বিষয় দুটি আপাতবিরোধী নয়, বরং প্রগতিরই স্বাভাবিক বাস্তবতা।”
বইটিতে জটিল পরিসংখ্যান বোঝাতে বিভিন্ন গ্রাফ ও ভিজ্যুয়াল ডেটার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, যা গ্যাsystem ও গ্যাপমাইন্ডার (Gapminder) ফাউন্ডেশনের উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় বহন করে। ভাষা অত্যন্ত শাণিত, ক্ষুরধার এবং সরাসরি পাঠকের সঙ্গে সংলাপে লিপ্ত হয়।
দশটি মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ ও চিন্তার সংস্কার
লেখকত্রয় মানুষের ভাবনাকে বিপথগামী করে এমন দশটি মৌলিক ‘ইনস্টিংক্ট’ বা সহজাত প্রবৃত্তি চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
- নেতিবাচকতার ফাঁদ (The Negativity Instinct): সংবাদমাধ্যমের স্বভাবই হলো খারাপ খবরকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো, কারণ ধীরগতির ইতিবাচক প্রগতি কখনোই শিরোনাম হয় না।
- সরলরেখার বিভ্রান্তি (The Straight-Line Instinct): কোনো সূচক ঊর্ধ্বমুখী মানেই তা অনন্তকাল সরলরেখায় বাড়তেই থাকবে—এমন ভ্রান্ত ধারণা থেকে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ নিয়ে অযথা আতঙ্ক তৈরি হয়।
- ভীতিমূলক প্রবৃত্তি (The Fear Instinct): মানুষ যে ঘটনাকে ভয় পায়, তাকেই পরিসংখ্যানগতভাবে বেশি বিপজ্জনক মনে করে; অথচ বাস্তবে সাপের কামড় বা বিমান দুর্ঘটনার চেয়ে ডায়রিয়া বা দূষিত পানিতে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেশি।
- দোষারোপের প্রবণতা (The Blame Instinct): জটিল সমস্যার জন্য আমরা সবসময় কোনো একক খলনায়ক খুঁজি, অথচ ব্যর্থতা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতা থেকে জন্ম নেয়।
সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনামূলক নিরীক্ষা
প্রশংসনীয় দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বেও ‘ফ্যাক্টফুলনেস’ কিছু ক্ষেত্রে অতি-আশাবাদের (naive optimism) অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারে। সমালোচকদের মতে, রস্লিং বৈশ্বিক গড় উন্নয়নকে যেভাবে মহিমান্বিত করেছেন, তাতে সমাজের ভেতরের ক্রমবর্ধমান সম্পদবৈষম্য এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার রূপটি অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্যের ধ্বংসের মতো অস্তিত্বসংকটের ক্ষেত্রে অতীত প্রগতির তথ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব। প্রযুক্তি ও মানবজাতির অভিযোজন ক্ষমতার ওপর রস্লিংয়ের মাত্রাতিরিক্ত আস্থা ক্ষেত্রবিশেষে একধরনের আত্মতুষ্টির জন্ম দিতে পারে।
চূড়ান্ত মূল্যায়ন ও পাঠযোগ্যতা
সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ‘ফ্যাক্টফুলনেস’ একুশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী গ্রন্থ। এটি আমাদের অন্ধ আশাবাদী বা নির্বোধ নৈরাশ্যবাদী হতে শেখায় না, বরং তৈরি করে একজন ‘সম্ভাবনাবাদী’ (possibilist) হিসেবে—যিনি তথ্যকে শ্রদ্ধা করেন এবং বিশ্বাস করেন সংকট সমাধানের পথ তথ্যের নির্ভুল বিশ্লেষণে নিহিত। সাংবাদিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক কিংবা যে কোনো সচেতন পাঠক, যিনি চটুল মতাদর্শের বাইরে এসে পৃথিবীর আসল চেহারাটি বুঝতে চান, তাঁদের প্রত্যেকের মননজগতে এই বই গভীর ও স্থায়ী পরিবর্তনের সঞ্চার করবে।
Enjoyed this review? Order the physical copy today.
Secure your printed edition with fast doorstep courier delivery.
Related Books You May Also Like
Reader Reviews & Ratings (0)
Real feedback and verified opinions from readers who purchased or read this title.
No reader reviews yet for this publication.

Factfulness


















